মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এল ১ কেজির সদ্যজাত! ৫ বার হার্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও কীভাবে অলৌকিক জীবন পেল শিশুটি?

ডাক্তারদের কেন ভগবান বলা হয়, তার এক অনুপম এবং নাটকীয় উদাহরণ দেখতে পাওয়া গেল রাজস্থানের বিকানেরে। শহরের পিবিএম (PBM) হাসপাতালের এনআইসিইউ (NICU) ওয়ার্ডে চিকিৎসকদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর অলৌকিক প্রচেষ্টায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে এক সদ্যজাত। মাত্র ২৯ সপ্তাহের গর্ভকালীন সময়ে জন্ম নেওয়া এবং মাত্র ১ কেজি ২০০ গ্রামের একটি অত্যন্ত দুর্বল শিশু এক বা দুইবার নয়, মোট পাঁচবার কার্ডিও রেস্পিরেটরি অ্যারেস্ট বা হৃদস্পন্দন ও শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো মারাত্মক পরিস্থিতিকে জয় করেছে। দীর্ঘ ২০ দিন ভেন্টিলেটর সাপোর্ট এবং প্রাণঘাতী মাল্টিড্রগ-রেসিফেন্ট (MDR) সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে টানা ৫৮ দিন পর শিশুটিকে সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় বাড়ি ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
হাসপাতালের শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ (প্রফেসর পেডিয়াট্রিক) ডা. পবন ডারা জানান, যোধপুরের বাপের বাসিন্দা সঞ্জু দেবী গত ৭ জুলাই এই প্রি-ম্যচিউর সন্তানের জন্ম দেন। জন্ম থেকেই শিশুটির শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত জটিল থাকায় তাকে পিবিএম-এর নবজাতক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ভর্তি করা হয়। গত ২৮ জুলাই হঠাৎই শিশুটির শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে। তার সারা শরীর নীল বর্ণ ধারণ করে এবং পালস বা নাড়ির গতি সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যায়। তবে কর্তব্যরত চিকিৎসক ও নার্সরা এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে তৎক্ষণাৎ সিপিআর (CPR) ও লাইফ সাপোর্ট দিয়ে তার নিভে যাওয়া প্রাণ ফিরিয়ে আনেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মোট পাঁচবার তার একই রকম কার্ড প্রতিহত করার মতো সংকট তৈরি হয়েছিল। এই দীর্ঘ লড়াইয়ে তাকে ২০ দিন মেকানিক্যাল ভেন্টিলেটর এবং ২৬ দিন ইনভেসিভ এয়ারওয়ে সাপোর্টে রাখা হয়।
মারণ ইনফেকশন ও অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের আশঙ্কা
শিশুটির বেঁচে থাকার লড়াইয়ের পথ মোটেও সহজ ছিল না। তার ফুসফুসে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক এমডিআর ক্লেবসিয়েলা ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়ে এবং শরীরের অভ্যন্তরীণ অংশে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। একই সঙ্গে তরতরিয়ে কমতে থাকে প্লেটলেটের মাত্রাও।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় চিকিৎসকরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে একাধিকবার রক্ত, পিআরবিসি, এফএফপি এবং প্লেটলেট ট্রান্সফিউশন করেন। এর পাশাপাশি ‘ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার’ (KMC) এবং মায়ের দুধের (EBM) মাধ্যমে শিশুটির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলা হয়। এই দীর্ঘ পরিচর্যার ফলে শিশুটির ওজন ১.২০ কেজি থেকে বেড়ে ১.৫৫ কেজি এবং দৈর্ঘ্য ৪১ সেন্টিমিটার থেকে বেড়ে ৪৪ সেন্টিমিটারে পৌঁছায়।
বিনামূল্যে চিকিৎসা ও পরিবারের স্বস্তি
শিশুরোগ বিভাগের প্রধান (HOD) ডা. জিএস তনওয়ার জানান, সরকারি হাসপাতালের উন্নত পরিকাঠামো এবং নিবেদিতপ্রাণ নার্সিং দল যে কতটা জটিল কেস সফলভাবে সামলাতে পারে, এই ঘটনা তারই প্রমাণ। সবথেকে বড় বিষয় হলো, অত্যন্ত ব্যয়বহুল এই চিকিৎসা মুখ্যমন্ত্রী আয়ুষ্মান আরোগ্য যোজনার মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিখরচায় সম্পন্ন হয়েছে, যার ফলে গরিব পরিবারটিকে কোনো আর্থিক সংকটের মুখে পড়তে হয়নি। ৫৮ দিনের এই টানটান উত্তেজনার পর চিকিৎসকদের আস্থার জয় এবং শিশুটির সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা চিকিৎসাবিজ্ঞানের কাছে এক বড় সাফল্য হিসেবেই দেখা হচ্ছে।