দেবতার চরণে ফুল-মিষ্টি নয়, নিবেদন করা হয় বিষাক্ত জীবন্ত বিছে! অন্ধ্রপ্রদেশের এই রোমহর্ষক রীতির রহস্য কী?

মন্দিরে দেবতার উদ্দেশে ফুল, ফল, মিষ্টি কিংবা দুধ নিবেদন করার চল চিরকালের। কিন্তু অন্ধপ্রদেশের একটি প্রাচীন মন্দিরে এমন এক আজব ও ভয়ংকর রীতি প্রচলিত রয়েছে, যা শুনলে যে কারো গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠবে। দেবতার পুজোয় সেখানে কোনো নৈবেদ্য নয়, বরং ভক্তরা নিবেদন করেন জীবন্ত বিষাক্ত বিছে! শুধু তাই নয়, একটুও ভয় না পেয়ে এই ভয়ংকর প্রাণীগুলিকে খালি হাতে গায়ে জড়িয়ে মন্দিরে হাজির হন ভক্তরা।
কোন্ডালারায়ুড়ু স্বামীর মন্দিরের ‘বিছে উৎসব’:
অন্ধ্রপ্রদেশের কুর্নুল জেলার কোডুমুরু এলাকার একটি পাহাড়ের ওপর অবস্থিত ঐতিহাসিক কোন্ডালারায়ুড়ু স্বামীর মন্দির। প্রতি বছর শ্রাবণ মাসের তৃতীয় সোমবার এখানে অত্যন্ত ঘটা করে বিশেষ ‘বিছে উৎসব’ বা পুজোর আয়োজন করা হয়। চলতি বছরেও গত ৩১ অগস্ট ঐতিহ্য মেনে এই অদ্ভুত রীতি পালিত হয়েছে। এই দিনটিকে কেন্দ্র করে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ ভিড় জমান ওই মন্দিরে।
পাথরের নিচ থেকে বিছে সংগ্রহ ও অদ্ভুত বিশ্বাস:
স্থানীয় প্রথা ও বিশ্বাস অনুযায়ী, মন্দিরের পাশের পাহাড়ের পাথরের নিচে প্রচুর বিছে লুকিয়ে থাকে। বিশেষ এই পুজো উপলক্ষে ভক্তরা খালি হাতে সেই পাথরগুলি সরিয়ে বিছে খুঁজে বের করেন। এরপর কোনো রকম ভয় না পেয়ে সেই বিছেগুলোকে হাতে তুলে নিয়ে মন্দিরে যান এবং কোন্ডালারায়ুড়ু স্বামীর চরণে সমর্পণ করেন।
এই রীতির সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর দিক হলো ভক্তদের অন্ধ বিশ্বাস। তাঁদের দৃঢ় ধারণা, ওই বিশেষ দিনে দেবদারু বা পাথরের বিছেরা কাউকে কামড়ায় না বা বিষাক্ত প্রভাব ফেলে না। এমনকী বিছে গায়ে ঘোরাবার সময় যদি ভুলবশত হুল ফুটিয়েও দেয়, তবে দেবতা কোন্ডালারায়ুড়ু স্বামীর কৃপায় কোনো বড় বিপদ বা ক্ষতি হবে না। অনেককে আবার শরীরের সংবেদনশীল অঙ্গ যেমন মুখ, কপাল কিংবা জিভের কাছেও ওই বিছেগুলি রাখতে দেখা যায়।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা প্রথা:
স্থানীয়দের দাবি, বিগত কয়েক দশক ধরে এই বিরল ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রথা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে। ভক্তদের বিশ্বাস, এভাবেই বিছে নিবেদন করলে মনের সমস্ত কামনা পূরণ হয় এবং দেবতা তাঁদের সুরক্ষাকবচ হয়ে রক্ষা করেন। শুধু তাই নয়, এর ফলে বাড়ির আশপাশে বা কৃষিকাজের জমিতে বিছের উপদ্রব থেকেও রেহাই মেলে বলে তাঁদের ধারণা।
ধর্মীয় বিশ্বাস, প্রাচীন লোকাচার এবং রোমহর্ষক সংস্কৃতির এক অদ্ভুত মিশ্রণ দেখতে পাওয়া যায় কোডুমুরুর এই বিছে-পুজোয়। প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ এই দৃশ্য দেখতে ভিড় জমালেও, চিকিৎসাকেন্দ্রে বা বিজ্ঞানীদের মতে, যেকোনো বিষাক্ত প্রাণীর সঙ্গে এমন অসাবধানী আচরণ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তবুও শতাব্দীপ্রাচীন এই প্রথা এবং ভক্তির টানকে অটুট রেখেই আজও সমানভাবে পালিত হয়ে চলেছে অন্ধপ্রদেশের এই অদ্ভুত উৎসব।