প্রতিটি ডিমের দাম ৯ টাকা ছুঁইছুঁই! শীত আসার আগেই সাধারণ মানুষের চিন্তা বাড়াল এই বিরাট খবর

গত এক বছরে দেশের বাজারে হু হু করে বেড়ে চলেছে ডিমের দাম। তবে এখানেই শেষ নয়, আসন্ন শীতের মরশুমে এই দাম আরও চড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। পোল্ট্রি খাদ্যের অন্যতম প্রধান উপাদান ভুট্টার দাম বৃদ্ধিই এই পরিস্থিতির জন্য মূলত দায়ী। বিশেষ করে ইথানল উৎপাদনের ক্রমবর্ধমান চাহিদা ভুট্টা সরবরাহের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করেছে। চিনির দাম বৃদ্ধির রেশ কাটতে না কাটতেই সাধারণ মানুষের হেঁশেলে এবার বড় ধাক্কা হয়ে আসছে ডিমের এই চড়া দাম।

কেন বাড়ছে ডিমের দাম?
ন্যাশনাল এগ কো-অর্ডিনেশন কমিটি (NECC)-এর তথ্য অনুযায়ী, বিগত এক বছরে ডিমের দাম প্রায় ৩৫ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে খামার পর্যায়ে প্রতিটি ডিমের দাম প্রায় ৭ টাকায় পৌঁছেছে, যা খুচরা বাজারে গিয়ে ক্রেতাদের জন্য ৮.৩০ টাকা থেকে ৯ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। পোল্ট্রি খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, শীতকালে সাধারণত ডিমের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ফলে এই মৌসুমি চাহিদা এবং উৎপাদনের উচ্চ খরচের জেরে আগামী দিনে দাম আরও বাড়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

ইথানল উৎপাদন কীভাবে প্রভাবিত করছে?
এই সংকটের মূল সূত্রপাত ভুট্টা থেকে। পোল্ট্রি খাদ্যের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ভুট্টা। কিন্তু বর্তমানে ভারতের মোট ভুট্টা উৎপাদনের একটি বিরাট অংশ চলে যাচ্ছে ইথানল ডিস্টিলারিগুলিতে। NECC-এর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মতে, দেশের মোট উৎপাদিত ভুট্টার প্রায় ৩৭ শতাংশই এখন ইথানল তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে, যার ফলে খামারিদের জন্য এই শস্যের সহজলভ্যতা দারুণভাবে কমে গেছে এবং উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে।

পোল্ট্রি খামারিদের ওপর আর্থিক চাপ
পোল্ট্রি খামারিদের মোট উৎপাদন খরচের প্রায় ৬৫ শতাংশ থেকে ৭০ শতাংশই ব্যয় হয় শুধু ভুট্টা কিনতে। তিন বছর আগে প্রতি টন ভুট্টার দাম যেখানে ছিল প্রায় ১৪,০০০ টাকা, তা লাফিয়ে বেড়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৬,৫০০ টাকায়। ‘ইকোনমিক টাইমস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেবল গত পাঁচ মাসের মধ্যেই ভুট্টার দাম প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। খাদ্যের এই আকাশছোঁয়া দাম খামারিদের মুনাফায় যেমন টান ফেলছে, তেমনই তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ডিম ও মুরগির মাংসের খুচরা বাজারে।

ইথানলের ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও অন্যান্য কারণ
পেট্রোলের ওপর নির্ভরতা কমাতে পেট্রোলের সঙ্গে জৈব-জ্বালানি বা ইথানল মেশানোর সরকারি লক্ষ্যমাত্রা বর্তমানে ২০ শতাংশে এসে ঠেকেছে। এর জেরে আখ ও ভুট্টার চাহিদা তুঙ্গে। ২০২২ সালে ভুট্টা-ভিত্তিক ইথানল উৎপাদনের পরিমাণ যেখানে মাত্র ১ মিলিয়ন টন ছিল, তা ২০২৪ সালে ৬ মিলিয়ন টন ছাড়িয়ে বর্তমানে প্রায় ১৭ মিলিয়ন টনে পৌঁছেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এটি ২৫ মিলিয়ন টনে পৌঁছাতে পারে বলে অনুমান বিশেষজ্ঞদের।

তবে কেবল ইথানলই নয়, এর পাশাপাশি তীব্র গরমের কারণে পোল্ট্রি মুরগির মৃত্যুহার বৃদ্ধি, আবহাওয়াজনিত বিপর্যয় এবং আমদানিকৃত খাদ্যের উপকরণের চড়া দামও উৎপাদন খরচ বাড়াতে সমানভাবে দায়ী।

হেঁশেলে অন্যান্য পণ্যের দামও ঊর্ধ্বমুখী
ডিমের পাশাপাশি রান্নাঘরের অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামেও লাগাম টানা যাচ্ছে না। দিল্লিতে বর্তমানে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্র ১৯টি শহরে ভর্তুকি মূল্যে (৩৫ টাকা প্রতি কেজি) পেঁয়াজ বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে। এর পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বেড়েছে গুড়ের দামও—জুলাই মাসে যা ছিল প্রতি কেজি ৭০ টাকা, তা এখন বেড়ে পৌঁছেছে ৯০ থেকে ১০০ টাকায়। সবমিলিয়ে সাধারণ মানুষের পকেটে টান পড়ার জোগাড় হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *