নেপালে প্রলয়ঙ্কারী বন্যায় হাজারেরও বেশি মৃত! জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিপূরণ চেয়ে আন্তর্জাতিক তহবিলের দরবারে কাঠমান্ডু

নেপালের রাসুয়া জেলায় সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বিধ্বংসী বন্যায় হাজারেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং এখনও বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ত্রাণ ও উদ্ধার কাজ চালানোর পাশাপাশি এই দুর্যোগের জন্য আন্তর্জাতিক ক্ষতিপূরণের দাবি তুলেছে নেপাল সরকার। ভারতসহ বেশ কয়েকটি দেশ এই পরিস্থিতিতে নেপালের পাশে দাঁড়িয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।
নেপাল সরকারের দাবি, ভোটেকোশি নদীর এই প্রলয়ঙ্কারী বন্যা সম্পূর্ণভাবে জলবায়ু পরিবর্তন-সম্পর্কিত একটি দুর্যোগ। তাই জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত লস অ্যান্ড ড্যামেজ বা ক্ষয়ক্ষতি তহবিল থেকে কাঠমান্ডুর আর্থিক সহায়তা পাওয়ার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। নেপালের জলবায়ু পরিবর্তন ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান ড. মহেশ্বর ধাকালের মতে, বৈশ্বিক কার্বন নির্গমনে নেপালের ভূমিকা অত্যন্ত নগণ্য হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক খেসারত দিতে হচ্ছে এই হিমালয়কন্যা দেশকে।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, নেপালের বার্ষিক মাথাপিছু কার্বন নির্গমন মাত্র ০.৫৪ টন। তুলনামূলকভাবে বৈশ্বিক গড় ৪.৬৭ টন, যেখানে চীনে এই পরিমাণ ৯.৩ টন এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১৩.৬ টন। নেপালের জোরালো যুক্তি, হিমালয়, ঘন অরণ্য, জীববৈচিত্র্য এবং কার্বন শোষক সংরক্ষণ করে দেশটি বিশ্বজুড়ে জলবায়ু ভারসাম্য রক্ষায় বরাবর বড় ভূমিকা পালন করে এসেছে। তাই আন্তর্জাতিক মহলের উচিত নেপালকে কেবল জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে না দেখে, বরং জলবায়ু ভারসাম্য রক্ষাকারী দেশ হিসেবে মূল্যায়ন করা। এই দাবি জানিয়ে ইতিমধ্যে তহবিলের বোর্ডের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন জমা দিয়েছে নেপাল।
কত টাকা আর্থিক সহায়তা পেতে পারে নেপাল?
ক্ষতিগ্রস্ত নেপাল ঠিক কী পরিমাণ অর্থ পাবে, তা নিয়ে এখনও চূড়ান্ত কোনো ঘোষণা হয়নি। তবে তহবিলের প্রাক্তন সহ-সভাপতি ও সদস্য রিচার্ড শেরম্যানের অনুমান অনুযায়ী, দেশটি সর্বোচ্চ ২০ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩ বিলিয়ন রুপি পেতে পারে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অর্থ নেপালের বিশাল ক্ষতির তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। কেবল সড়ক বিভাগের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাঘাট ও সেতু পুনর্নির্মাণেই প্রায় ৫০ বিলিয়ন নেপালি রুপি খরচ হতে পারে।
আন্তর্জাতিক তহবিলের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বিশাল অঙ্কের সহায়তা পেতে হলে নেপালকে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করতে হবে যে রাসুয়ার বন্যা সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল। এর জন্য দুর্যোগের সুনির্দিষ্ট কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির একটি বিশদ বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন প্রয়োজন। তবে সবচেয়ে বড় সংকট হলো আন্তর্জাতিক এই তহবিলটির নিজস্ব আর্থিক সক্ষমতা। বর্তমানে তহবিলটি ১৩৪টি দেশের কাছে ৫ থেকে ২০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত সহায়তার প্রস্তাব চেয়েছে, অথচ ১০০টিরও বেশি দেশ ইতিমধ্যে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার সাহায্যের অনুরোধ করে বসে আছে। কাগজে-কলমে তহবিলটি প্রায় ৮২০ মিলিয়ন ডলার সাহায্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও বিশেষজ্ঞদের দাবি, বর্তমানে তাদের অ্যাকাউন্টে মাত্র ৪০০ মিলিয়ন ডলারের মতো জমা রয়েছে। ফলে এই বিপুল পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতির মুখে আন্তর্জাতিক সাহায্য কতটা মিলবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন থেকেই যাচ্ছে।