স্কুল বাঁচবে নাকি মন্দির? গঙ্গার ভয়াল গ্রাসের সামনে দাঁড়িয়ে গ্রামবাসীদের এই কঠিন প্রশ্নে তোলপাড় মালদা!

গঙ্গার গ্রাস থেকে নিজেদের তিল তিল করে গড়ে তোলা ভিটেমাটি আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচানোর আকুতি নিয়ে চরম বিপর্যয়ের মুখে মালদার রতুয়া ১ নম্বর ব্লকের মহানন্দটোলা গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকা। গত বছর কান্তটোলা ও শ্রীকান্তটোলা গ্রাম মানচিত্র থেকে চিরতরে মুছে যাওয়ার পর, চলতি বছর গঙ্গার ভয়াল ভাঙন শুরু হয়েছে মুলিরামটোলা এবং জিতুটোলায়। আর এই সর্বগ্রাসী নদীর সামনে দাঁড়িয়েই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—গঙ্গার হাত থেকে আগে কে রক্ষা পাবে, শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্কুল নাকি শতবর্ষী শিবমন্দির?

নদীর পেটে স্কুল, বন্ধ পঠনপাঠন: জিতুটোলা প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ১৯৭৩ সালে চালু হয়েছিল। কিন্তু গঙ্গার তীব্র ভাঙনে বর্তমানে এই স্কুলের নিচ থেকেই মাটি সরে গিয়ে স্রোত বইতে শুরু করেছে। দুই বছর আগেও যে প্রাঙ্গণ কচিকাঁচাদের কলকাকলিতে মুখরিত থাকত, আজ সেখানে কেবলই গঙ্গার জলের গর্জন। বাধ্য হয়েই প্রশাসন স্কুলটি বন্ধ করে দিয়েছে এবং শিক্ষকদের অন্য জায়গায় বদলি করা হয়েছে। এর ফলে এলাকার দু’-আশো শিশুর পড়াশোনা পুরোপুরি শিকেয় উঠেছে। অধিকাংশ পড়ুয়াই বাধ্য হয়ে বই-খাতা তুলে রেখেছে।

ঝুঁকিতে ঐতিহাসিক শিবমন্দির ও বাড়িঘর: একইভাবে, পাশের গ্রাম মুলিরামটোলার ১৯৫৪ সালে তৈরি একটি প্রাচীন শিবমন্দিরও এখন নদীর একেবারে কিনারায় দাঁড়িয়ে। মন্দিরের চারপাশে খাল তৈরি হয়ে যাওয়ায় যেকোনো মুহূর্তে তা ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেচ দফতরের পক্ষ থেকে কিছু বালির বস্তা ফেলা হলেও গ্রামবাসীদের স্পষ্ট অভিযোগ, পাথরের কাজ ছাড়া এই ভাঙন ঠেকানো অসম্ভব। স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের বসতবাড়িগুলো পর্যন্ত ভেঙে সরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। পরিযায়ী শ্রমিক সন্তোষ স্বর্ণকার বা রাধেশ্যামবাবুর মতো অনেকেই সর্বস্ব হারিয়ে এখন সম্পূর্ণ দিশেহারা।

প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের প্রতিক্রিয়া: গ্রামবাসীদের এই তীব্র ক্ষোভ ও যন্ত্রণার কথা যখন স্থানীয় বিজেপি সাংসদ খগেন মুর্মুর কাছে পৌঁছায়, তখন তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তুলনার সমালোচনা করে জানান যে, সরকার ভাঙন রোধে সমস্ত দিক থেকেই সচেষ্ট রয়েছে। তবে শুখা মরশুম না আসা পর্যন্ত স্থায়ী কাজ করা সম্ভব নয় বলেই মত প্রশাসনের। অন্যদিকে, জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শক (প্রাথমিক) মলয় মণ্ডল জানিয়েছেন যে, প্রশাসন জমির ব্যবস্থা করে দিলেই ক্ষতিগ্রস্ত স্কুল দুটিকে অন্য জায়গায় নতুনভাবে তৈরি করে দেওয়া হবে। তবে এত আশ্বাসের পরেও গঙ্গার ভাঙনের কবলে পড়ে সর্বস্ব হারানোর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন মহানন্দটোলার সাধারণ মানুষ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *