সেতু নেই তো কী হয়েছে! স্কুল যেতে জলের উপর গাছের গুঁড়িতে ভরসা খুদেদের, রাজস্থানের এই ছবি দেখলে বুক কেঁপে উঠবে

একদিকে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি, পরিকাঠামো গঠন এবং ‘শুধুমাত্র পড়াশোনা করলেই ভারতের সার্বিক উন্নতি হবে’—নানা মহলে এই ধরনের বড় বড় বুলি ও উন্নয়নের দীর্ঘ চওড়া দাবি প্রায়শই শোনা যায়। কিন্তু অন্যদিকে, সমাজের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা কিছু করুণ ও যুগান্তকারী ছবি সেই সমস্ত দাবিকে নিমেষে মিথ্যা প্রমাণ করে দেয়। রাজস্থানের প্রতাপগড় জেলা থেকে সম্প্রতি এমনই এক মর্মান্তিক ও উদ্বেগজনক ছবি সামনে এসেছে, যা সেখানকার শিক্ষা ব্যবস্থা এবং সমগ্র প্রশাসনের উদাসীনতাকে তীব্র প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

গাছের গুঁড়িতে ভরসা, প্রতিদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়া!
সোশ্যাল মিডিয়ায় বর্তমানে একটি ভিডিও দ্রুত গতিতে ভাইরাল হচ্ছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে কিছু নিষ্পাপ স্কুলছাত্রছাত্রী স্কুল যাওয়ার পথে প্রতিদিন ঠিক কতটা মর্মান্তিক ঝুঁকির মুখোমুখি হয়। রাজস্থানের প্রতাপগড় জেলার উদিয়াখেড়ি গ্রামের এই ঘটনায় দেখা গিয়েছে, গ্রামে একটি পাকা তো দূরস্ত, যাতায়াতের জন্য নালার উপর কোনো সেতুই নেই। আর সেই কারণেই চরম বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে ছোট্ট ছোট্ট এই পড়ুয়াদের স্কুলে পৌঁছানোর জন্য একমাত্র ভরসা নালার উপর আড়াআড়িভাবে পড়ে থাকা একটি সরু গাছের গুঁড়ি!

ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওয় অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই দেখা যাচ্ছে যে, শিশুরা অত্যন্ত সাবধানে প্রতিটি পা ফেলে নর্দমাটি পার হওয়ার চেষ্টা করছে এবং নিজেদের ভারসাম্য বজায় রাখার আকুল লড়াই চালাচ্ছে। সামান্য একটু এদিক-ওদিক হলেই পা পিছলে বড় কোনো মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে তারা। তা সত্ত্বেও পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ ও জেদের কারণে এই কোমলমতি শিশুরা প্রতিদিন স্কুল যাওয়ার জন্য বাধ্য হয়ে নিজেদের জীবন বাজি রাখছে।

স্বাধীনতার এত বছর পরেও মেলেনি পাকা সেতু!
স্থানীয় গ্রামবাসীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ এবং আক্ষেপ, দেশের স্বাধীনতার দীর্ঘ দশক কেটে গেলেও তাঁদের এই অভাগা গ্রামের ভাগ্যের বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি। দশকের পর দশক ধরে উন্নয়নের আলো থেকে বঞ্চিত এই গ্রাম। বর্ষাকাল এলেই যখন নর্দমা উপচে জল বাড়তে থাকে, তখন গোটা গ্রাম দেশের বাকি অংশ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

গ্রামের এক প্রবীণ বাসিন্দা বাবুলাল আক্ষেপের সুরে জানিয়েছেন, “গত ২০ বছর ধরে আমরা নিয়মিত প্রশাসন ও সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে এই নালার উপর একটি পাকা সেতু নির্মাণের জন্য লিখিত আবেদন করে আসছি। কিন্তু আজ পর্যন্ত আমাদের কোনো আবেদনেই কেউ কর্ণপাত করেনি। যখনই বিধানসভা বা লোকসভা নির্বাচন আসে, বড় বড় রাজনৈতিক নেতারা বাড়ি বাড়ি এসে নানা রকম লোভনীয় প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট কুড়িয়ে চলে যান। কিন্তু নির্বাচন মিটে গেলেই আমাদের এই নরকযন্ত্রণার কথা সবাই ভুলে যায়। প্রতি বছর আমাদের অবুঝ ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খাতিরে স্কুলে যাওয়ার জন্য এভাবে প্রতিদিন মৃত্যুর মুখে ঝাঁপ দিতে হয়।”

সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিবাদের ঝড় ও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা
ছোট্ট শিশুদের এই অত্যন্ত বিপজ্জনক ও রোমহর্ষক যাতায়াতের ভিডিওটি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়তেই দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। নেটিজেনরা সোজা আঙুল তুলেছেন সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের ব্যর্থতার দিকে। ভিডিওটি শেয়ার করে প্রত্যেকেই একটি প্রশ্নই বারবার তুলেছেন— তবে কি কোনো বড় ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটার পরেই আমলা ও মন্ত্রীদের কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙবে? এখন দেখার বিষয়, এই ভাইরাল ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পর দায়িত্বশীল প্রশাসনিক কর্তারা শেষ পর্যন্ত নিজ দায়িত্বে জেগে উঠে উদিয়াখেড়ির গ্রামবাসীদের এই দুই দশকের দীর্ঘ অভিশপ্ত যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেন কি না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *