হিমালয়ের বুকে মহাপ্রলয়! নেপালের বন্যায় ১৩৩ জন ভারতীয় নিখোঁজ, আসল কারণ জানলে শিউরে উঠবেন

গত বুধবার নেপালের হিমালয় সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নেমে আসা এক ভয়াবহ ও প্রলয়ঙ্করী হড়পা বানে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে গোটা জনপদ। কৈলাস মানস সরোবর যাত্রায় যাওয়া বেশ কয়েকটি দল এই আকস্মিক বন্যার মুখে পড়ে। এই সর্বগ্রাসী দুর্যোগে এখনও পর্যন্ত অন্তত ১৬০ জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। তবে ভারতের জন্য সবথেকে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, নিখোঁজদের এই তালিকায় রয়েছেন ১৩৩ জন ভারতীয় তীর্থযাত্রী ও পর্যটক। ভোতে কোশী ও ত্রিশূলী নদী অববাহিকায় রাসুওয়া ও নুওয়াকোট অঞ্চলে এই তাণ্ডব চলেছে। রাস্তাঘাট, সেতু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় উদ্ধারকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ভারত সরকারের পক্ষ থেকেও ইতিমধ্যেই ত্রাণের হাত বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্ধারে সমন্বয় রক্ষা করা হচ্ছে।

ঠিক কী কারণে ঘটল এই মহা-বিপর্যয়?
এই মর্মান্তিক বন্যার মূল উৎস লুকিয়ে রয়েছে সীমান্ত পেরিয়ে তিব্বতের উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে, যেখানে হিমালয়ের ভূতাত্ত্বিক গঠন অত্যন্ত সংবেদনশীল ও অস্থির। তিব্বত মূলত একটি বিশাল উচ্চ মালভূমি, যা ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের নিরন্তর সংঘর্ষের ফলে গঠিত হয়েছে। এখানে খাড়া পাহাড়, গভীর উপত্যকা এবং ভঙ্গুর শিলাগঠনের ওপর বিশাল বিশাল হিমবাহ অবস্থান করে।

প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, এই ঘটনায় ওই অঞ্চলের একটি হিমবাহ ও সংলগ্ন শিলার একটি অংশ আকস্মিক ভেঙে পড়ে। এর ফলে বিশাল এক ধ্বংসাবশেষ ও পাথরের স্রোত লেন্দে খোলা (Lhende Khola) নদীতে আছড়ে পড়ে এবং সেখান থেকে নিচে নেপালের দিকে নেমে আসে। এই ধসের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে এর জেরে তৈরি হওয়া সিসমিক এনার্জিকে প্রথমে ভূমিকম্প বলে ভুল করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা। পরবর্তীতে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক সার্ভে (USGS) নিশ্চিত করে যে এই কম্পন আসলে হিমবাহ ধস ও তার জেরে সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ থেকেই হয়েছিল।

তিব্বত কেন পৃথিবীর ‘তৃতীয় মেরু’?
তিব্বতি মালভূমি এবং সংলগ্ন হিন্দুকুশ-কারাকোরাম-হিমালয় পর্বতমালাকে অনেক সময় পৃথিবীর ‘তৃতীয় মেরু’ (Third Pole) বলা হয়। কারণ উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর বরফাবৃত অঞ্চলগুলির বাইরে এখানেই পৃথিবীর সর্বাধিক পরিমাণে হিমবাহ, বরফক্ষেত্র এবং জমে থাকা জলের ভাণ্ডার রয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪,৯৫০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই অঞ্চলটিকে এশিয়ার প্রাকৃতিক ‘জলের টাওয়ার’ বলা হয়। সিন্ধু, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের মতো ১০টি প্রধান নদীর উৎসস্থল এই অঞ্চল, যা সরাসরি downstream-এর দেড়শো কোটিরও বেশি মানুষের জীবনজীবিকা ও জলসুরক্ষা নিশ্চিত করে।

এই ‘তৃতীয় মেরুর’ ক্রায়োস্ফিয়ার অত্যন্ত জটিল। এখানে ৬০ হাজারের বেশি হিমবাহ রয়েছে, যাতে প্রায় ৬ হাজার ঘন কিলোমিটার বরফ সঞ্চিত আছে। এছাড়া পারমাফ্রস্ট এবং ‘রক গ্ল্যাসিয়ার’ বা পাথুরে হিমবাহের মধ্যে জলের বিশাল ভাণ্ডার লুকিয়ে রয়েছে। তিব্বতের এই বিশাল উচ্চতা প্রতি বছর ভারত ও ইউরেশীয় প্লেটের ৪০ থেকে ৫০ মিলিমিটার বেগে সংঘর্ষের ফলে তৈরি হচ্ছে, যা এই অঞ্চলকে অত্যন্ত সক্রিয় ও বিপজ্জনক করে তোলে।

জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাব
চলমান জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে বিশ্বের গড় তাপমাত্রার তুলনায় তিব্বতের এই ‘তৃতীয় মেরু’ অনেক দ্রুত উষ্ণ হয়ে উঠছে। ২০০০ সালের পর থেকে এখানে বরফ গলে যাওয়ার হার দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এর ফলে মালভূমির হিমবাহগুলি দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে, পারমাফ্রস্ট নষ্ট হচ্ছে এবং হিমবাহের হ্রদগুলি (Glacial Lakes) আকারে বিশাল আকার ধারণ করছে। ফলস্বরূপ, আকস্মিক হিমবাহ ধস, ভূমিধস এবং হ্রদ ফেটে গিয়ে হড়পা বান বা GLOF-এর মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বহুলাংশে বেড়ে গেছে। যা আগামী দিনে সমগ্র হিমালয় অঞ্চল এবং নিচের নদী অববাহিকাগুলির জন্য এক চরম আশঙ্কার বার্তা বয়ে আনছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *