এক দশক পর ফের বিদেশ থেকে আমদানি করতে হবে চিনি? উৎসবের মরসুমের আগেই বাজারে কোন বড় আশঙ্কার কালো মেঘ?

ভারতে আখের পর্যাপ্ত উৎপাদন থাকা সত্ত্বেও বাজারের জোগান নিয়ে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একদিকে দেশের জ্বালানি তেলের আমদানি নির্ভরতা কমাতে আখের একটি বিরাট অংশ চলে যাচ্ছে ইথানল উৎপাদনে, আর অন্যদিকে আসন্ন উৎসবের মরসুমের আগে হু হু করে চড়ছে চিনির বাজারদর। পরিস্থিতি এতটাই সংকটজনক হয়ে উঠেছে যে, প্রায় এক দশক পর ফের বিদেশ থেকে চিনি আমদানির কথা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হচ্ছে কেন্দ্রকে। একই সঙ্গে বাজারে কৃত্রিম সংকট রোধ করতে মজুতের ওপর কড়া বিধিনিষেধও জারি করা হয়েছে।
মহারাষ্ট্রের কোলহাপুরে পাইকারি বাজারে অগস্টের শুরু থেকেই চিনির দাম প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে প্রতি ১০০ কেজিতে ৫,৩৫০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। গত মঙ্গলবার সারা দেশে খুচরো বাজারে চিনির গড় দাম ছিল কেজিপ্রতি ৫২.৩০ টাকা। কিন্তু পঞ্জাবের কিছু কিছু জায়গায় তা ইতিমধ্যেই ৬৫ টাকা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। এ ছাড়াও মুম্বই ও ভোপালের মতো বড় শহরগুলিতে খুচরো দাম ঘোরাফেরা করছে ৫৮ থেকে ৬৩ টাকার মধ্যে।
সামনে রয়েছে গণেশ চতুর্থী, দুর্গাপুজো, দীপাবলি এবং বড়দিনের মতো একের পর এক উৎসব। এই মরসুমে মিষ্টি ও অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যে চিনির চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বহুগুণ বেড়ে যায়। ফলে আগামী দিনে জোগানে আরও বড় টান পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত নতুন মজুতসীমা (Stock Limit) চালু করেছে কেন্দ্র। নির্দেশিকায় জানানো হয়েছে, যেসব ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠান মাসে ১০ মেট্রিক টনের বেশি চিনি ব্যবহার করেন, তাঁরা এবার থেকে সর্বোচ্চ ১৫ দিনের স্টক নিজেদের কাছে রাখতে পারবেন।
চিনির এই মূল্যবৃদ্ধির নেপথ্যে প্রধান কারণ হিসেবে উঠে আসছে সরকারের উচ্চাভিলাষী ইথানল নীতি। ২০% ইথানল মিশ্রণের (E20) লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে গিয়ে গত কয়েক বছরে আখের একটি বড় অংশ চিনি তৈরির পরিবর্তে ইথানল উৎপাদনে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি দেশজুড়ে ৪৯৯টি কেন্দ্রে বছরে প্রায় ১,৮২২ কোটি লিটার ইথানল উৎপাদনের ক্ষমতা তৈরি হয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানির জন্য আখ সরিয়ে নেওয়ার ফলেই চিনির সরবরাহে এই টান পড়েছে। লখনউ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তথা কৃষি বিশেষজ্ঞ সুধীর পানওয়ারের মতে, আখের উৎপাদন বাড়লেও তার কত অংশ চিনিতে আর কত অংশ জ্বালানিতে যাচ্ছে, সেই ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি। তাছাড়া, উত্তরপ্রদেশে ফসলের নানা রোগের কারণে গত মরসুমে আখের ফলন ও চিনি নিষ্কাশনের হারও কিছুটা কমেছে।
আগামী দিনে দেশের চিনির মজুত বা ওপেনিং স্টক নিয়েও বড়সড় আশঙ্কার কথা শুনিয়েছে শিল্পমহল। ২০২৬-২৭ মরসুমের শুরুতে উদ্বোধনী মজুত কমে ৪০-৪২ লক্ষ টনে নেমে আসতে পারে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেকটাই কম। এই ঘাটতি মেটাতে রফতানি বন্ধ রাখার পাশাপাশি এবার চিনির ওপর থাকা ১০০ শতাংশ আমদানি শুল্ক কমানোর কথা ভাবছে কেন্দ্র। একই সঙ্গে ইথানলের জন্য আখ সরানোর পরিমাণ কমিয়ে চিনির উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ভি অনন্ত নাগেশ্বরনও খাদ্য বনাম জ্বালানির এই বাস্তব ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। সব মিলিয়ে, জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে ইথানল তৈরি নাকি সাধারণ মানুষের রান্নাঘরের জন্য পর্যাপ্ত চিনি—এই দুয়ের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।