ছবি দেখেই জিভে জল আসে কেন? মন আর পেটের এই অদ্ভুত খেলার আসল সত্যিটা জানেন কি?

গরম ধোঁয়া ওঠা বিরিয়ানি, রসগোল্লা কিংবা রাস্তার ধারের ফুচকার ছবি দেখেই কি এক নিমেষে জিভে জল চলে আসে? এমনকি পেট সম্পূর্ণ ভরা থাকলেও পছন্দের খাবার চোখের সামনে ভেসে উঠলে ফের তা খাওয়ার প্রবল ইচ্ছে জাগে। এটি নিছক কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়, বরং আমাদের শরীর ও মস্তিষ্কের অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি বৈজ্ঞানিক প্রতিক্রিয়া।

কীভাবে কাজ করে ব্রেনের ‘রিওয়ার্ড সিস্টেম’? বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, যখন আমরা কোনো লোভনীয় বা সুস্বাদু খাবারের ছবি দেখি, তখন প্রথমে চোখের মাধ্যমে সেই দৃশ্য মস্তিষ্কে পৌঁছয়। সঙ্গে সঙ্গেই সক্রিয় হয়ে ওঠে মস্তিষ্কের ‘রিওয়ার্ড সিস্টেম’। শরীরকে তখন বার্তা দেওয়া হয় যে সুস্বাদু খাবার আসছে, তাই দ্রুত হজমের প্রস্তুতি শুরু করো। এই নির্দেশের ফলেই লালাগ্রন্থি অতিরিক্ত লালা তৈরি করতে শুরু করে, যাকে সহজ ভাষায় আমরা ‘জিভে জল আসা’ বলে থাকি।

জিভে জল আসার আসল কাজ কী? অনেকেরই ধারণা, খাবার দেখে জিভে জল আসা মানেই বোধহয় অতিরিক্ত লোভ বা আসক্তি। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, এর নেপথ্যে রয়েছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু শারীরিক প্রয়োজন। লালার মূল কাজগুলি হলো:

  • খাবারকে নরম করে সহজে চিবোতে সাহায্য করা এবং গলাধঃকরণে সুবিধা করা।

  • লালায় উপস্থিত বিশেষ এনজাইম বা উৎসেচক মুখেই কার্বোহাইড্রেট হজম করার প্রক্রিয়া শুরু করে দেয়।

  • মুখের ভেতর আর্দ্রতা বজায় রাখে এবং ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে সুরক্ষা বলয় তৈরি করে। অর্থাৎ, খাবার মুখে তোলার আগেই শরীর নিজেই হজমের জন্য নিখুঁতভাবে প্রস্তুত হতে শুরু করে।

পেট ভরা থাকলেও কেন খিদে পায়? এই অদ্ভুত আচরণের নেপথ্যে রয়েছে ‘হেডোনিক হাঙ্গার’ (Hedonic Hunger) বা আনন্দের খিদে। আমাদের শরীরে মূলত দুই ধরনের খিদে কাজ করে। একটি হলো সত্যিকারের শারীরিক খিদে, যখন কোষের শক্তির প্রয়োজন হয়। আর অন্যটি হলো স্বাদ, সুবাস ও চাক্ষুষ আকর্ষণে তৈরি হওয়া মানসিক খিদে। ভরপেট দুপুরের খাবারের পরও যদি হঠাৎ গরম জিলিপি বা আইসক্রিম দেখে খেতে ইচ্ছে করে, তবে বুঝতে হবে সেখানে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে আপনার পেট নয়, বরং মস্তিষ্ক।

শুধু দেখা নয়, খাবারের সুবাস বা গন্ধও একই কায়দায় লালাক্ষরণ বাড়িয়ে দেয়। কোনো রেস্তরাঁর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কাবাব বা কফির সুবাস নাকে আসতেই খিদে পেয়ে যাওয়ার আসল কারণ এটাই। গন্ধ এবং দৃশ্য একসঙ্গে মিলে মস্তিষ্কে আরও শক্তিশালী সংকেত পাঠায়।

নিজেকে কি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব? বিশেষজ্ঞদের মতে, এই শারীরিক প্রক্রিয়াকে পুরোপুরি আটকে রাখা না গেলেও কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ঘন ঘন সোশ্যাল মিডিয়ায় খাবারের লোভনীয় ভিডিও বা ছবি দেখলে অপ্রয়োজনীয়ভাবে খাওয়ার প্রবণতা অনেকটাই বেড়ে যায়। তাই সত্যি সত্যিই খিদে পেয়েছে কি না তা যাচাই করা, পাতে পর্যাপ্ত প্রোটিন ও ফাইবারযুক্ত খাবার রাখা এবং তাড়াহুড়ো না করে মনোযোগ দিয়ে ধীরে ধীরে খাওয়ার অভ্যাস করলে অতিরিক্ত খাওয়ার ঝুঁকি সহজেই কমানো সম্ভব।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *