বাবার নেই সামর্থ্য, তবুও জেদের বশে ইউপিএসসি ক্র্যাক! বিরুদেবের এই রূপকথার জয় চোখ জুড়োবে

মোবাইল হারিয়ে গিয়েছিল, থানায় গিয়ে সঠিক সাহায্যও পাননি। আর সেই ছোট্ট একটি অপমানের তিক্ত অভিজ্ঞতা এবং ক্ষোভই চিরতরে বদলে দিয়েছিল এক তরুণের জীবনের লক্ষ্য। ঠিক করেছিলেন, পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, একদিন তিনি নিজেই পুলিশ অফিসার হবেন। সেই জেদ আর কঠিন লড়াইয়ের পথ ধরেই এবার ইতিহাস গড়লেন মহারাষ্ট্রের কোলহাপুর জেলার কাগল তহশিলের ইয়ামগে গ্রামের বিরুদেব সিদ্ধাপ্পা ঢোণে। ২০২৪ সালের সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় সর্বভারতীয় স্তরে ৫৫১তম র‍্যাঙ্ক অর্জন করে তিনি এখন দেশের গর্ব, একজন সফল আইপিএস (IPS)।

ছোট্ট গ্রামের জীবন ও কঠিন সংগ্রাম: বিরুদেবের জীবন শুরু থেকেই মোটেও সহজ ছিল না। তাঁর পরিবার ছিল চরম আর্থিক অনটনে জর্জরিত। তাঁর বাবা সিদ্ধাপ্পা দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করার পর সংসারের হাল ধরতে ছাগল চরানোর কাজ শুরু করেছিলেন। পরিবারের প্রতিদিনের পেটের ভাত জোগাড় করাই যেখানে ছিল বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে ছেলের পড়াশোনা বজায় রাখা ছিল এক বিশাল যুদ্ধ। অভাব থাকলেও বাবা-মা ছেলের শিক্ষায় কোনো দিন কমতি রাখেননি।

স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে বিরুদেব নিজের মেধার জোরে পুনের নামী সিওইপি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (COEP Engineering College)-এ পড়াশোনা করার সুযোগ পান। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ডিগ্রি অর্জনের পরই তাঁর মনে জেদ খোলে দেশের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা UPSC ক্র্যাক করার।

মোবাইল হারানোই জীবনের বড় মোড়: একদিন একটি মোবাইল ফোন হারিয়ে যাওয়ায় থানায় অভিযোগ করতে গিয়েছিলেন বিরুদেব। কিন্তু সেখান থেকে যে অভিজ্ঞতা তাঁর হয়েছিল, তা তাঁকে ভিতর থেকে নাড়িয়ে দেয়। পুলিশের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সাহায্য না পেয়ে তাঁর মনে প্রশ্ন জেগেছিল—”পুলিশ যদি মানুষের সমস্যার সমাধান করার জায়গা হয়, তবে আমি নিজেই কেন পুলিশ অফিসার হব না?” এই একটি খারাপ অভিজ্ঞতাকেই তিনি হতাশা হিসেবে না দেখে নিজের জীবনের জ্বালানি বানিয়ে নেন।

এরপর দিল্লির মতো ব্যয়বহুল শহরে ইউপিএসসির প্রস্তুতি নিতে পাড়ি দেন তিনি। একদিকে শহরবাসীর জীবনযাত্রার খরচ, অন্যদিকে পরিবারের সীমিত আয়—দুটোর ভারসাম্য বজায় রাখা ছিল অসম্ভব কঠিন। বাবা মাঝে মাঝে অন্য কোনো ছোট চাকরি করে নেওয়ার পরামর্শ দিলেও, নিজের লক্ষ্যে অনড় ছিলেন বিরুদেব। প্রতি মাসে বাবা কোনোমতে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা পাঠাতেন দিল্লির ঠিকানায়। সেই কষ্টার্জিত টাকা আর নিজের অদম্য পরিশ্রমকে হাতিয়ার করেই এগোতে থাকেন তিনি।

সফলতার স্বর্ণালী মুহূর্ত: অবশেষে ২০২৪ সালের ইউপিএসসি পরীক্ষার ফলপ্রকাশের দিনে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। অল ইন্ডিয়া র‍্যাঙ্ক ৫৫১ অর্জন করে আইপিএস হিসেবে নির্বাচিত হন বিরুদেব। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁকে কাগল তহশিল থেকে ইউপিএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রথম প্রার্থী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যাঁর বাবা ছাগল চরিয়েছেন, সেই পরিবারের ছেলে আজ দেশের অন্যতম শীর্ষ প্রশাসনিক পদে। বাবা-মায়ের পড়াশোনা খুব বেশিদূর না এগোলেও, তাঁরা ঠিক বুঝেছিলেন—তাঁদের ছেলে আজ ‘সাহেব’ হয়ে গিয়েছে।

বিরুদেবের এই গল্প শুধু একজন আইপিএস অফিসার হওয়ার গল্প নয়, এটি হাজার হাজার লড়াই করা তরুণের অনুপ্রেরণা। অভাব বা প্রতিকূল পরিস্থিতি আপনার শুরুর পথ ঠিক করে দিতে পারে, কিন্তু আপনার শেষটা কেমন হবে, তা ঠিক করে আপনার অদম্য জেদ আর পরিশ্রম—বিরুদেব সিদ্ধাপ্পা ঢোণে সেটাই প্রমাণ করে দেখালেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *