শ্যুটিংয়ের মাঝেই হঠাৎ বড় দুর্ঘটনা! না ফেরার দেশে চলে গেলেন টলিউডের গুণী পরিচালক রাজা সেন

প্রয়াত হলেন জাতীয় পুরস্কারজয়ী বর্ষীয়ান চলচ্চিত্র পরিচালক রাজা সেন (Raja Sen)। কিছুদিন আগে বাড়িতে হঠাৎ পড়ে গিয়ে কোমরে মারাত্মক চোট পেয়েছিলেন তিনি। এরপর তাঁকে কলকাতার এসএসকেএম (SSKM) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ সকাল দশটা নাগাদ তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে গোটা টলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে। পরিচালকের মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসতেই সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি অত্যন্ত আবেগঘন ও দীর্ঘ পোস্ট করেছেন বিশিষ্ট অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত।

এক যুগের অবসান, শোকস্তব্ধ ঋতুপর্ণা

প্রয়াত পরিচালকের সঙ্গে একাধিক স্মরণীয় ছবিতে কাজ করার সুবাদে দীর্ঘদিনের পেশাদার ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল ঋতুপর্ণার। সোশ্যাল মিডিয়ায় সেই সোনালী স্মৃতির পাতা উল্টে অভিনেত্রী লিখেছেন, ‘রাজাদা আমাদের কাছে একটা যুগ ছিলেন। রাজা সেনের লেগ্যাসি, তাঁর ব্যক্তিত্ব এবং ভাবনা ওঁর কাজের মধ্যেই প্রকাশ পেয়েছে।’ তপন সিনহার মতো বিভিন্ন ধরনের বিষয় বা ‘ভ্যারাইটি অফ সাবজেক্টস’ নিয়ে তিনি যেভাবে কাজ করেছেন, তা সত্যিই তুলনাহীন।

পরিচালকের বিখ্যাত কাজগুলির কথা স্মরণ করে ঋতুপর্ণা উল্লেখ করেন— ‘দামু’, ‘আত্মীয়স্বজন’, ‘খাঁচা’, ‘তিন মূর্তি’, ‘মায়ামৃদঙ্গ’ কিংবা ‘দেবীপক্ষ’-এর মতো অসাধারণ সব ফিচার ফিল্মের পাশাপাশি কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব শম্ভু মিত্রকে নিয়ে করা তাঁর প্রামাণ্যচিত্রগুলো আজও দর্শকের মনে দাগ কেটে আছে। তিনি ছিলেন টলিউডের একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র, যাঁর প্রয়াণে আজ ছন্দপতন ঘটল।

কাজের সঠিক মূল্যায়ন নিয়ে ক্ষোভ ও আক্ষেপ

পরিচালকের প্রয়াণের পাশাপাশি ইন্ডাস্ট্রির সংস্কৃতি নিয়ে চরম আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন ঋতুপর্ণা। তাঁর সাফ কথা, রাজা সেন ইন্ডাস্ট্রির এক উজ্জ্বল রত্ন হওয়া সত্ত্বেও তিনি কি তাঁর কাজের সঠিক মূল্যায়ন পেয়েছিলেন? অনেক মানুষই যোগ্য না হয়েও নানা সম্মান পেয়ে যান, অথচ রাজা সেনের কাজের প্রকৃত মূল্যায়ন সেভাবে হয়নি। আমরা তাঁকে সেই সম্মান দিতে পারিনি।

অভিনেত্রী আরও লিখেছেন, ‘আজ উনি চলে যাওয়ায় আমরা সত্যি একজন অভিভাবক হারা হলাম। উনি আমার কাছে একজন ফাদার ফিগার (Father Figure) ছিলেন। আমাকে ভীষণ স্নেহ করতেন।’ হাসপাতালে ভর্তি থাকাকালীন তাঁকে দেখতে যাওয়ার মুহূর্তটির কথা স্মরণ করে অভিনেত্রী জানান, সেই অবস্থাতেও পরিচালক তাঁর হাত ধরে অত্যন্ত স্নেহের সুরে বলেছিলেন, “তুমি এসেছ কেন? মাস্ক পরোনি কেন?” এই ভালোবাসা ও অভিভাবকসুলভ স্নেহ তিনি আর কোথাও পাবেন না বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

কাস্টিংয়ের জাদুকর ও শেষ দেখার স্মৃতি

জয়া বচ্চন, রঘুবীর যাদব, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সন্ধ্যা রায়, তাপস পাল কিংবা বেণুদার মতো প্রখ্যাত শিল্পীদের নিয়ে অত্যন্ত অভিনব সব কাস্টিং ও বিষয়বস্তু পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন রাজা সেন। তাঁকে একজন ‘রেয়ার ডিরেক্টর’ বা দুর্লভ প্রতিভাধর পরিচালক হিসেবে উল্লেখ করে ঋতুপর্ণার আক্ষেপ, সেই দুর্লভ সম্মান হয়তো তিনি জীবদ্দশায় পাননি। এর জন্য গোটা ইন্ডাস্ট্রির বড় জায়গায় থাকা মানুষদের দায়বদ্ধতার প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।

হাসপাতালে শেষ সাক্ষাতের স্মৃতিচারণ করে অভিনেত্রী জানান, গুরুতর অসুস্থ অবস্থাতেও পরিচালকের চোখে-মুখে ছিল বেঁচে থাকার এবং কাজ করার তীব্র জেদ। তাঁর হাত ধরে রাজা সেন বলেছিলেন, ‘হাসপাতাল থেকেই বেরিয়েই কিন্তু ছবিটা করব। আমি ঠিক হয়ে যাচ্ছি, ভালো হয়ে যাচ্ছি।’ কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না, না ফেরার দেশে পাড়ি দিলেন বাংলা সিনেমার এক অন্যতম কারিগর।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *