উত্তরবঙ্গের ‘চেরাপুঞ্জি’! ভুটান ও কালিম্পংয়ের কোলে লুকিয়ে থাকা এই মায়াবী গ্রামটির নাম জানেন?

ভুটান ও কালিম্পং পাহাড়ের মায়াময় কোলে লুকিয়ে রয়েছে এমন এক অপরূপ স্থান, যাকে ভ্রমণপিপাসুরা ভালোবেসে নাম দিয়েছেন ‘উত্তরবঙ্গের চেরাপুঞ্জি’। একঝলক দেখলেই মন হারাতে বাধ্য যে কেউ। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, পর্যটন মানচিত্রে এই জায়গাটুকু উপযুক্ত পরিচিতি পেলে ঘুরে যাবে এখানকার অর্থনীতি, তৈরি হবে নতুন কর্মসংস্থান এবং রুটিরুজির টানে আর ভিন রাজ্যে কাজের খোঁজে পাড়ি দিতে হবে না এলাকার তরুণ প্রজন্মকে।
মেঘপিওনের দেশে মেঘবালিকার মিতালি
একদিকে ভুটানের সুবিশাল পাহাড়ি প্রাচীর, অন্যদিকে কালিম্পংয়ের মেঘে ঢাকা উপত্যকা—এই দুইয়ের ঠিক মাঝখান দিয়ে ছন্দ তুলে বয়ে চলেছে রূপসী মূর্তি নদী। চারপাশে বিশাল চা-বাগান, ঘন জঙ্গলের সবুজ চাদর আর পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ। প্রকৃতির এই অপার্থিব মেলবন্ধনের মাঝে শান্ত-স্নিগ্ধ হয়ে ঘুমিয়ে রয়েছে সামসিং এলাকার এক রূপকথা সদৃশ গ্রাম ইয়াংটং।
স্থানীয়দের দাবি, ইয়াংটংয়ে এমন একটা দিনও বিরল যেদিন আকাশ থেকে অন্তত এক ফোঁটা বৃষ্টির দেখা মেলে না। আর এই অবিরাম বর্ষণ ও মেঘ-বৃষ্টির লুকোচুরি খেলার টানেই এটি সাধারণ মানুষের মনে ‘উত্তরবঙ্গের চেরাপুঞ্জি’ হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। সরকারি খাতায় কোনো নির্দিষ্ট তকমা না থাকলেও, অফবিট ডেস্টিনেশন প্রেমীদের কাছে ইয়াংটং এক মায়াবী অনুভূতির নাম।
অপরূপ সৌন্দর্য ও পর্যটনের অপার সম্ভাবনা
সামসিংয়ের চা-বাগানের আঁকাবাঁকা পথ ধরে কিছুটা এগোলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ইয়াংটংয়ের আসল সৌন্দর্য। নদীর বুকে বড় বড় পাথরের ওপর বসে ভুটান ও কালিম্পংয়ের পাহাড়ের খেলা দেখা যেন এক স্বর্গীয় অনুভূতি। শুধু প্রকৃতিই নয়, ভাগ্য ভালো থাকলে এখানে দেখা মিলতে পারে নানা বন্যপ্রাণীরও। শীতের মিষ্টি রোদমাখা ভোর কিংবা পাহাড়ি সূর্যাস্ত—প্রতিটি মুহূর্তই পর্যটকদের মোহিত করার জন্য যথেষ্ট।
তাছাড়া, এর পাশেই রয়েছে ঝালং, বিন্দু এবং কুমাইয়ের মতো জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রগুলি, যা একে একটি পূর্ণাঙ্গ ও জমজমাট ট্যুরিস্ট সার্কিট হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আদর্শ করে তুলেছে।
উন্নয়নের আলো ও স্থানীয়দের না বলা আক্ষেপ
তবে এই অপরূপ সৌন্দর্যের নেপথ্যেই লুকিয়ে রয়েছে এক করুণ বাস্তব। পর্যটন পরিকাঠামোর ব্যাপক অভাব, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সরকারি প্রচারের আলোর বাইরে থাকার কারণে ইয়াংটং এখনও অন্তরালেই থেকে গেছে। কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগের অভাবে এলাকার বহু মানুষকে বাধ্য হয়ে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে পাড়ি জমাতে হয়েছে ভিন রাজ্যে বা দূর-দূরান্তে।
এলাকাবাসীদের দীর্ঘদিনের একটাই দাবি—প্রশাসন যদি এই লুকিয়ে থাকা রত্নকে রাজ্যের অফিশিয়াল পর্যটন মানচিত্রে উপযুক্ত স্থান দেয়, তবেই এখানকার মানুষের ভাগ্যের চাকা ঘুরবে। সঠিক প্রচার, হোমস্টে নির্মাণ এবং সুগম রাস্তার ব্যবস্থা হলে তৈরি হতে পারে স্বনির্ভরতার নতুন পথ। প্রকৃতি যেখানে দুহাতে সৌন্দর্য উজাড় করে দিয়েছে, সেখানে সামান্য একটু সরকারি সহযোগিতাই পারে ইয়াংটংকে পর্যটনের নতুন নক্ষত্র বানিয়ে স্থানীয় মানুষের মুখে স্থায়ী হাসি ফোটাতে।