প্রধান বিচারপতির মন্তব্য বিকৃত করার অভিযোগ! নড়েচড়ে বসল সুপ্রিম কোর্ট, তলব সিবিআইকে

‘ককরোচ’ বা আরশোলা সংক্রান্ত একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া তীব্র বিতর্কের জেরে এবার কঠোর পদক্ষেপ করল সুপ্রিম কোর্ট। নিট প্রশ্নফাঁস ইস্যু থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে শোরগোল ফেলা ওই মন্তব্যের প্রায় তিন মাস কেটে যাওয়ার পর, এবার পুরো বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্র এবং সিবিআইয়ের (CBI) কাছে জবাব তলব করল শীর্ষ আদালত। অভিযোগ উঠেছে, ভার্চুয়াল আদালতের লাইভ কার্যবিবরণীর নির্দিষ্ট কিছু অংশ বেছে নিয়ে অত্যন্ত কৌশলে তা এডিট করা হয়েছে এবং বিচারপতির ওই মন্তব্যকে বেআইনিভাবে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি প্রধান বিচারপতি ঠিক যে প্রেক্ষাপটে ওই মন্তব্যটি করেছিলেন, তার সম্পূর্ণ উল্টো বা ভিন্ন অর্থ জনমানসে তুলে ধরা হয়েছে বলেও অভিযোগ। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে দায়ের হওয়া একটি জনস্বার্থ মামলাতেই নড়েচড়ে বসল আদালত।
সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বিশেষ বেঞ্চে মঙ্গলবার এই মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে চলা এই শুনানিতে আবেদনকারী তথা আইনজীবী রাজা চৌধুরী আদালতের সামনে চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, গত ১৫ মে-র একটি মামলার শুনানিতে সম্পূর্ণ আলাদা ও নির্দিষ্ট একটি প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতির মুখ থেকে ‘ককরোচ’ শব্দটি উচ্চারিত হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই ভিডিওর একটি অংশমাত্র কেটে নিয়ে তা এডিট করা হয় এবং বিভিন্ন মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা হয়। তাঁর মতে, এর ফলে দেশের বিচারব্যবস্থার পবিত্রতা ও মর্যাদা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের মনে প্রতিষ্ঠানের আস্থাকে নড়বড়ে করে দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে।
কী দাবি জানানো হয়েছে মামলায়?
আবেদনকারীর তরফে শীর্ষ আদালতের কাছে জোরালো দাবি জানানো হয়েছে যে, বিচারপতিদের মৌখিক পর্যবেক্ষণ বা রূপক মন্তব্যের এহেন বাণিজ্যিক ব্যবহার, ট্রেডমার্কের অপব্যবহার, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে প্রচার কিংবা বিনা অনুমতিতে কনটেন্ট ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত অভিযুক্ত ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট আইনে নিরপেক্ষ তদন্ত করে কঠোর পদক্ষেপ করা হোক। একইসঙ্গে আবেদনে এও স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, দেশের সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকে যেকোনো ন্যায্য সমালোচনা, গণতান্ত্রিক ভিন্নমত প্রকাশ, ব্যঙ্গ এবং বাকস্বাধীনতার অধিকারকে তাঁরা পূর্ণ শ্রদ্ধা করেন এবং তা বজায় রাখা উচিত। কিন্তু তার আড়ালে বিচারব্যবস্থাকে হেয় করার এই প্রবণতা বরদাস্ত করা যায় না।
কোন প্রসঙ্গে করেছিলেন ‘ককরোচ’ মন্তব্য?
আদালতে ‘সঞ্জয় দুবে বনাম দিল্লি হাইকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল’ মামলার গত ১৫ মে-র শুনানির প্রসঙ্গটি তুলে ধরেন আইনজীবী রাজা চৌধুরী। তিনি জানান, মূলত ভুয়ো আইনজীবীদের রমরমা ও দৌরাত্ম্যের প্রসঙ্গ ধরেই ওই ‘ককরোচ’ মন্তব্য করেছিলেন প্রধান বিচারপতি। আদালতের বিচার প্রক্রিয়াকে অসাধু উপায়ে অপব্যবহার করা, পেশাগত নৈতিক মানের অবনতি এবং এর জেরে সামগ্রিক বিচারব্যবস্থার উপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে—এই সমস্ত অত্যন্ত গুরুতর বিষয়গুলি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করার সময়ই রূপক অর্থে ওই মন্তব্যটি করা হয়েছিল।
আবেদনকারীর আরও অভিযোগ, গত ১৫ মে-র পর থেকে আদালতের লাইভ কার্যবিবরণীর বিভিন্ন অংশ ইচ্ছাকৃতভাবে কেটে জোড়া দিয়ে তৈরি করা ভুয়ো ভিডিও ক্লিপিংয়ের সংখ্যা সোশ্যাল মিডিয়ায় আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গিয়েছে। আদালতের শুনানির সময় বিচারপতিদের করা মৌখিক পর্যবেক্ষণগুলিকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে সেগুলি দিয়ে নানারকম মিম তৈরি করা হচ্ছে। এরপর সেই সমস্ত বিভ্রান্তিকর ভিডিও ও মিম সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে দিয়ে অসৎ উপায়ে বাণিজ্যিক ফায়দা লোটার চেষ্টা চলছে। আদালতের বক্তব্যের এই বিকৃত উপস্থাপনার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মনে বিচারব্যবস্থা ও বিচারপতিদের সম্পর্কে নেতিবাচক ও ভুল ধারণা তৈরি করার এক সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র চলছে বলেই অভিযোগ উঠেছে।