এআই কি আইটি সেক্টর শেষ করে দেবে? বাজারের এই ভীতিকে পুঁজি করে কোটি কোটি টাকা লাভ করল দেশের বৃহত্তম বিমা সংস্থা

শেয়ার বাজারে প্রায়শই একটি প্রবাদ প্রচলিত রয়েছে— যখন সকলে ভীত থাকে, তখন বিনিয়োগ করার সেটাই হলো সেরা সময়। ভারতের লাইফ ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশন (LIC) ঠিক এই কৌশলকেই কাজে লাগিয়ে আবারও এক ঐতিহাসিক সাফল্যের নজির গড়ল। কিছুদিন আগেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-এর আগ্রাসনে ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি (IT) খাতের ব্যবসায়িক মডেল ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় বাজারে চরম আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। সেই অনিশ্চয়তার জেরে বিনিয়োগকারীরা যখন আইটি কোম্পানির শেয়ার জলের দরে বিক্রি করে পালাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই সম্পূর্ণ ঠান্ডা মাথায় এক সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ নেয় এলআইসি। আর এই দুঃসাহসিক সিদ্ধান্তের জেরে মাত্র ৩৫ দিনের মধ্যেই ২১,০০০ কোটি টাকারও বেশি মুনাফা অর্জন করেছে দেশের এই শীর্ষ বিমা কোম্পানি।
তিন আইটি মহারথীতে বাজিমাত
বাজারের সমস্ত আশঙ্কার বিপরীতে গিয়ে এলআইসি মূলত দেশের তিনটি প্রধান আইটি কোম্পানি— টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস (TCS), ইনফোসিস (Infosys) এবং এইচসিএল টেকনোলজিস (HCL Technologies)-এ বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে।
জুন মাসের শেষে এই তিনটি সংস্থায় এলআইসি-র মোট শেয়ারের মূল্য যেখানে ১.০৫ লক্ষ কোটি টাকা ছিল, তা গত ৪ঠা আগস্টের মধ্যে লাফিয়ে বেড়ে ১.২৬ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এই বিপুল লাভের সবথেকে বড় অংশটি এসেছে টিসিএস থেকে:
টিসিএস (TCS): এখানে এলআইসি-র বিনিয়োগের পরিমাণ ৮,৩০৬ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮,৯২৬ কোটি টাকায়।
ইনফোসিস (Infosys): এই সংস্থায় লগ্নির মূল্য ৭,২১৩ কোটি টাকা বেড়ে হয়েছে ৫১,১১৭ কোটি টাকা।
এইচসিএল টেক (HCL Tech): এখানে শেয়ারের মূল্য ৫,৫১৩ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২৬,৩০৬ কোটি টাকায়।
এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। সুপরিকল্পিতভাবে জুন ত্রৈমাসিকে এলআইসি তাদের পোর্টফোলিওতে টিসিএস-এর ১ কোটি ৪৫ লক্ষ, ইনফোসিসের প্রায় ৬০ লক্ষ এবং এইচসিএল টেকের প্রায় ৪৭ লক্ষ নতুন শেয়ার যুক্ত করেছিল। এর ফলে জুনের শেষ থেকে নিফটি আইটি সূচক ঘুরে দাঁড়ায় এবং প্রায় ১৯ শতাংশের শক্তিশালী বৃদ্ধি রেকর্ড করে।
ভুল প্রমাণিত হলো এআই-এর আতঙ্ক
জেনারেটিভ এআই-এর প্রভাবে সফটওয়্যার সেক্টরে ব্যাপক চাকরিচ্যুতি ও মন্দার আশঙ্কায় যখন বাজার কাঁপছিল, তখন এলআইসি এই ধসকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে। তবে পুরো খাতের ওপর অন্ধভাবে টাকা ঢালেনি তারা। বরং বাছাবাছি করে কৌশলগত বিনিয়োগ করেছে বিমা সংস্থাটি।
সংযুক্ত শেয়ার: প্রধান কোম্পানিগুলির পাশাপাশি এলআইসি পারসিস্টেন্ট সিস্টেমসের ৭ লক্ষ ৬০ হাজার এবং কোফোর্জের ১ লক্ষ ৮০ হাজার শেয়ার নিজেদের পোর্টফোলিওতে যুক্ত করেছে।
বর্জন নীতি: অন্যদিকে, তুলনামূলকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ মনে হওয়ায় উইপ্রোর ১ কোটি ৪০ লক্ষ, টেক মাহিন্দ্রার ৩১.৫৪ লক্ষ এবং ওরাকল ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেসের ২ লক্ষ ৩৫ হাজার শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছে তারা।
বাজারের ভীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এলআইসি-র এই বিচক্ষণ বিনিয়োগ প্রমাণ করে দিল যে, সঠিক সময়ে সঠিক ঝুঁকি নিতে জানলে মন্দার বাজারেও সোনা ফলানো সম্ভব।