কাটা ঘুড়ি ধরতে গিয়েই সব শেষ! পুকুরের জলে ডুবে মর্মান্তিক মৃত্যু ৯ বছরের বালকের

কাটা ঘুড়ির পিছনে ধাওয়া করতে গিয়ে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হলো ৯ বছরের এক বালক। পুকুরের জলে ডুবে মৃত্যু হয়েছে রোহণ শেখ নামের ওই শিশুর। মর্মান্তিক এই ঘটনাটি ঘটেছে দক্ষিণ ২৪ পরগনার মগরাহাট থানার অন্তর্গত দক্ষিণ কাশি কাটিকাটপাড়া এলাকায়। রোহণের আকস্মিক এই মৃত্যুতে শোকে পাথর হয়ে গেছে তার পরিবার ও পুরো এলাকাবাসী।

ঠিক কী ঘটেছিল?
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, গত মঙ্গলবার বিকেলে মগরাহাট বিডিও অফিস সংলগ্ন একটি মাঠে এলাকার অন্যান্য কিশোরদের সঙ্গে ঘুড়ি ওড়াচ্ছিল রোহণ। বিকেলের মনোরম হাওয়ায় আকাশে একের পর এক ঘুড়ি উড়ছিল। ঠিক সেই সময়ই একটি ঘুড়ি কেটে গিয়ে মাঠের পাশের একটি পুকুরের দিকে চলে যায়।

অন্যান্য শিশুদের মতো রোহণও সেই কাটা ঘুড়িটি ধরার জন্য উদগ্রীব হয়ে দৌড়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের জোরালো অনুমান, ঘুড়িটি সরাসরি জলে পড়ে যাওয়ায় সেটি তুলতে গিয়েই রোহণ পুকুরে নেমেছিল। আর তাতেই ঘটে যায় বড় বিপত্তি।

দীর্ঘ তল্লাশির পর উদ্ধার
বেশ অনেকক্ষণ কেটে যাওয়ার পরও রোহণ বাড়ি না ফেরায় এবং তাকে কোথাও খুঁজে না পাওয়ায় পরিবারের লোকজনের সন্দেহ হয়। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতেই চারদিকে শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। পরে স্থানীয় বাসিন্দারাও এই তল্লাশিতে যোগ দেন।

পুকুরের ধারে রোহণের শেষ উপস্থিতির কথা জানতে পেরে স্থানীয়দের সন্দেহ হয় যে সে হয়তো জলে তলিয়ে গেছে। এরপর কয়েকজন স্থানীয় যুবক ও বাসিন্দা জলে নেমে জাল দিয়ে তল্লাশি শুরু করেন। দীর্ঘক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে পুকুরের জলের তলা থেকে রোহণকে উদ্ধার করা হয়।

দ্রুত তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় মগরাহাট গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানান যে, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই শিশুটির মৃত্যু হয়েছে। ছোট্ট রোহণের নিথর দেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তার বাবা-মা ও আত্মীয়-স্বজন। এলাকায় নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া।

প্রতিবেশীদের দাবি ও মৃগীর সমস্যার প্রসঙ্গ
প্রতিবেশীদের অনেকেই জানান, রোহণ অত্যন্ত চঞ্চল ও হাসিখুশি স্বভাবের একটি ছেলে ছিল। প্রতিদিনের মতো সেদিনও সে খেলতে বেরিয়েছিল, কিন্তু কে জানত যে সেই খেলাটাই তার জীবনের শেষ খেলা হয়ে দাঁড়াবে!

স্থানীয় এক বাসিন্দা মহম্মদ আতিয়ার রহমান লস্কর জানান, “বিকেলে মাঠে অনেক ছেলেই খেলছিল। সম্ভবত ঘুড়ি তুলতেই রোহণ পুকুরে নেমেছিল। তবে রোহণের মৃগীর সমস্যা ছিল। জলে নামার পর হয়তো তার সেই পুরনো অসুস্থতা দেখা দেয়, যার ফলে সে নিজেকে সামলাতে পারেনি এবং জলের তলায় তলিয়ে যায়।” যদিও এই দাবির পক্ষে এখনও কোনো সরকারি বা চিকিৎসাগত নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।

পুলিশের পদক্ষেপ ও এলাকাবাসীর ক্ষোভ
ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই মগরাহাট থানার পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। পুলিশ মৃতদেহটি উদ্ধার করে সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর ময়নাতদন্তের জন্য ডায়মন্ড হারবার পুলিশ মর্গে পাঠিয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ আধিকারিক জানিয়েছেন, “প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে খেলতে গিয়ে অসাবধানতাবশত ছেলেটি জলে পড়ে যায় বা পুকুরে নেমে দুর্ঘটনার শিকার হয়। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্তের রিপোর্টের অপেক্ষা করা হচ্ছে। রিপোর্ট হাতে আসার পরই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ করা হবে।”

এদিকে এই মর্মান্তিক ঘটনার পর এলাকার নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। স্থানীয়দের একাংশের ক্ষোভ, মাঠের পাশেই অরক্ষিত ও বড় পুকুর থাকা সত্ত্বেও সেখানে কোনো ধরনের সতর্কীকরণ বোর্ড বা নিরাপত্তা বেষ্টনী নেই। প্রতিদিন বহু শিশু ও কিশোর ওই মাঠে খেলাধুলা করতে আসে। ভবিষ্যতে যাতে এমন হৃদয়বিদারক ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তার জন্য প্রশাসনের কাছে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *