মোদী-শাহের কাছে এই আন্দোলন সম্পূর্ণ ‘আউট অফ সিলেবাস’! যন্তর মন্তরের রণক্ষেত্র নিয়ে বিস্ফোরক মহুয়া মৈত্র

দিল্লিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ কমার বিন্দুমাত্র লক্ষণ নেই, বরং বুধবার সকাল থেকেই যন্তর মন্তরে জমায়েত আরও ঘন হতে শুরু করেছে। জলবায়ু কর্মী সোনম ওয়াংচুক-এর আমরণ অনশনের ২৫ দিন অতিক্রান্ত হলেও নিজের দাবিতে অনড় রয়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)। তাদের স্পষ্ট দাবি, নিট (NEET) প্রশ্ন ফাঁস ও সর্বস্তরের অনিয়মের দায় স্বীকার করে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে।
মঙ্গলবার সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন অভিযানের পর, বুধবারেও সমানে জারি রয়েছে বিরোধীদের সম্মিলিত বিক্ষোভ। পরিস্থিতির তীব্রতা বুঝে আগের চার দফা দাবির সঙ্গে এবার যুক্ত করা হয়েছে আরও এক বিস্ফোরক দাবি—কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের অবিলম্বে পদত্যাগ! গোটা পরিস্থিতি সামলাতে গিয়ে নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহের সরকার সম্পূর্ণ দিশেহারা বলে কটাক্ষ করেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের লোকসভার সাংসদ মহুয়া মৈত্র। তাঁর মতে, এই গণবিক্ষোভ বর্তমান সরকারের কাছে সম্পূর্ণ ‘আউট অফ সিলেবাস’।
আন্তর্জাতিক স্তরেও প্রতিবাদের ঝড়: নিউ ইয়র্ক থেকে লন্ডন
দিল্লির রাজপথ পেরিয়ে এই প্রতিবাদের আঁচ এখন পৌঁছে গেছে আন্তর্জাতিক মঞ্চেও। সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, সোনম ওয়াংচুকের দীর্ঘ অনশন আন্দোলনকে সমর্থন জানাতে রাস্তায় নেমেছে আমেরিকার বিশিষ্ট ‘অ্যাডভোকেসি গ্রুপ’ ‘হিন্দুস ফর হিউম্যান রাইটস’।
সংগঠনের উদ্যোগে নিউ ইয়র্কের বিখ্যাত ইউনিয়ন স্কোয়্যার এবং সান হোসে শহরে মহাত্মা গান্ধীর মূর্তির সামনে বিশাল প্রতিবাদ সভা ও জমায়েত অনুষ্ঠিত হয়। বিদেশের মাটির সেই সমাবেশ থেকেও একসুরে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা দাবি করা হয়েছে। শুধু আমেরিকা নয়, একই দাবিতে ব্রিটেনের লন্ডন এবং আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন শহরেও এই সংগঠনের ব্যানারে তীব্র প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়েছে।
রাহুল গান্ধীর ৫ দফা দাবি ও রাজনৈতিক গ্রেফতারি
পুলিশি বর্বরোচিত আচরণের প্রতিবাদে মঙ্গলবার খোদ রাজপথে নেমেছিলেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এবং শিবসেনা (উদ্ধব গোষ্ঠী) প্রধান উদ্ধব ঠাকরের মতো জাতীয় শীর্ষ নেতারা। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন অভিমুখে কংগ্রেসের মিছিল থেকে রাহুল-প্রিয়াঙ্কাদের আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এছাড়া গভীর রাতে যন্তর মন্তরে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট ছোড়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাজধানীর প্রশাসনিক উত্তেজনার পারদ চড়েছে চরমে।
আটক থাকা অবস্থাতেই একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়ে ৫ দফা দাবি পেশ করেছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী:
১. স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ: শুধুই শিক্ষামন্ত্রী নন, পুরো দমনপীড়নের প্রধান হোতা হিসেবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকেও পদত্যাগ করতে হবে।
২. পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা: সোমবার যন্তর মন্তর ও সংসদ ভবনের কাছে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর ‘হামলাকারী’ অত্যাচারী পুলিশকর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
৩. মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার: আন্দোলনে নামার অপরাধে পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে পুলিশ যে সমস্ত এফআইআর (FIR) দায়ের করেছে, তা অবিলম্বে নিঃশর্তে প্রত্যাহার করতে হবে।
৪. প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা: রাজপথে পুলিশি অত্যাচারের দায় সরাসরি স্বীকার করে দেশের ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমাপ্রার্থনা করতে হবে সরকারকে।
৫. সংসদে বিবৃতি ও আলোচনা: গোটা ঘটনার ওপর সংসদের ভেতরে দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিতে হবে এবং নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি নিয়ে চলতি বাদল অধিবেশনেই বিশদ আলোচনার ব্যবস্থা করতে হবে।
সংসদের অন্দরেও জোরালো প্রতিবাদের সুর
শুরু থেকেই এই আন্দোলনের পাশে রয়েছে বাংলার শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। একুশে জুলাইয়ের মঞ্চ থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সিজেপি-র এই লড়াইয়ের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় বুধবার উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় ছাত্র-যুবদের গণতান্ত্রিক মিছিলে ‘পুলিশি হামলা’র প্রতিবাদে সংসদীয় নিয়ম মেনে আলোচনার নোটিস পাঠিয়েছেন রাজ্যসভায় তৃণমূলের মুখ্য সচেতক নাদিমূল হক।
অন্যদিকে, কৃষ্ণনগরের সাংসদ মহুয়া মৈত্র শুরু থেকেই সোনম ওয়াংচুক ও সিজেপি-র পাশে রয়েছেন। বুধবার সোশ্যাল মিডিয়ায় এক ভিডিও বার্তায় তিনি চরম কটাক্ষ করে বলেন, “এই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন এখন মোদী-শাহের কাছে একেবারে ‘আউট অফ সিলেবাস’ হয়ে দাঁড়িয়েছে! মোদী এবং শাহ আদতে জানেনই না যে এই ধরনের অদম্য গণপরিস্থিতি কীভাবে সামাল দিতে হয়। কারণ, এতদিন তাঁরা কেবল তাঁদেরই সামলাতে অভ্যস্ত ছিলেন, যাঁরা ক্ষমতার দাপটে ভয় পান। কিন্তু যাঁরা ভয় পেতে ভুলে গিয়েছেন, তাঁদের সামনে এই সমীকরণ ব্যর্থ হতে বাধ্য।”
হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট ‘ব্লক’ করার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ
রাজনীতির পারদ যখন চড়ছে, ঠিক তখনই এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ এনেছেন সিজেপি-র প্রধান মুখপাত্র সৌরভ দাস। তাঁর দাবি, এই আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে প্রযুক্তিগতভাবেও তাদের ওপর সাইবার আক্রমণ চালানো হচ্ছে। চক্রান্ত করে তাঁর ব্যবহৃত হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্টটি ‘ব্লক’ করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তুলে তিনি প্রশ্ন করেছেন, “মেটা (Meta) কি পারবে এভাবে অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে কোটি কোটি মানুষের লড়াইয়ের কণ্ঠকে চিরতরে স্তব্ধ করতে?” উল্লেখ্য, গত সোমবার সিজেপি-র সংসদ ভবন অভিযানকে কেন্দ্র করে পুলিশি ব্যারিকেড, জলকামান ও টিয়ার গ্যাসের বাধা পেরিয়ে আন্দোলনকারীরা প্রায় সংসদ ভবনের দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজধানীর এই ছাত্র আন্দোলন কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।