যন্তর মন্তরে ফের কি ‘কেজরিওয়াল মুহূর্ত’? নতুন রাজনৈতিক দল CJP কি পারবে ইতিহাস গড়তে?

যন্তর মন্তর মানেই যেন ভারতের রাজনৈতিক ডামাডোলের এক সাক্ষী। কখনো শাসকের বিরুদ্ধে কণ্ঠস্বর, কখনো নতুন রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্মভূমি—আবার কখনো নাগরিকদের জাতীয় সংলাপের পুনর্লিখন। আজও সেই চত্বরে ভিড় করছেন হাজার হাজার তরুণ, যাদের দাবি স্পষ্ট: সরকারি সংলাপে স্বচ্ছতা এবং কর্তৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের ঔদ্ধত্যের অবসান।
আকাশে মেঘলা মনসুন, যেন শহরের বাতাসেও এক রাজনৈতিক ঝড়ের প্রতীক্ষা। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, ১৫ বছর আগের রাজনৈতিক জলবায়ু আর আজকের ভারতের পরিস্থিতির মধ্যে কতটা মিল রয়েছে?
২০১১ বনাম ২০২৬: ইতিহাসের ছায়া
২০২৬ সালের এই পরিস্থিতি অনেকটা ২০১১ সালের সেই পরিচিত সিনেমার চিত্রনাট্যের মতোই। তখন আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন আন্না হাজারে, আর রাজনৈতিক মুখ হিসেবে উঠে এসেছিলেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল। দুর্নীতিবিরোধী লড়াই, রাজপথ থেকে সংসদীয় রাজনীতিতে উত্থান, তারপর ধীরে ধীরে সেই সাফল্যের ঔজ্জ্বল্য ম্লান হয়ে যাওয়া—ভারতের রাজনীতি এই পুরো চক্রটি একবার দেখেছে।
আজ ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP) ঠিক সেই একই মোহনায় দাঁড়িয়ে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি সিজেপি-র জন্য এক ‘আম আদমি পার্টি মুহূর্ত’ (AAP Moment)। অভিজিৎ দপকের সামনে এখন প্রশ্ন—এই দল কি শুধুই রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য প্রতিবাদ করবে, নাকি তারা সরাসরি ক্ষমতার রাজনীতিতে নামার উচ্চাকাঙ্ক্ষা রাখে?
সিজেপি-র জন্য তিন কঠিন পাঠ
যেকোনো রাজনৈতিক আন্দোলন মনে করে তারা অন্য সবার চেয়ে আলাদা, কিন্তু অধিকাংশেরই পরিণতি একই। সিজেপি-র টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন:
১. একক চরিত্রের ওপর নির্ভরতা নয়: আন্দোলন কোনো একজন ব্যক্তির মুখ বা নির্দিষ্ট একটি ইস্যুর ওপর দাঁড়িয়ে থাকলে তা টেকসই হয় না। দলকে এমনভাবে গড়তে হবে, যাতে প্রধান মুখ না থাকলেও তা টিকে থাকতে পারে।
২. সোশ্যাল মিডিয়া বনাম বুথ লেভেল: ইনস্টাগ্রামের ‘রিলস লাইক’ আর ভোটের বাক্সের ব্যালট এক নয়। ভিড় মানেই জনমত নয়—এই পার্থক্যটি বুঝে বুথস্তরে কাজ করা জরুরি।
৩. অস্পষ্টতা বর্জন: দলটিকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে, তারা কি শুধুই একটি ‘প্রেশার গ্রুপ’ নাকি ভবিষ্যৎ নির্বাচনে লড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে? উভয় নৌকায় পা দিয়ে দীর্ঘসময় টিকে থাকা অসম্ভব।
সিস্টেমের ফাঁদ থেকে মুক্তি
প্রতিটি সরকারবিরোধী আন্দোলনই স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি নিয়ে শুরু হয়, কিন্তু ক্ষমতায় গেলেই ক্ষমতার দম্ভ বা ‘স্ট্যাটাস কো’-এর লোভ তাদের গ্রাস করে। আসল পরীক্ষা তো শুধু সিস্টেমের বিরুদ্ধে লড়াই করা নয়, বরং সিস্টেমের অংশ হয়েও সেই দম্ভকে প্রতিহত করা। অরবিন্দ কেজরিওয়াল বিশ্বাস করতেন, ক্ষমতা ছাড়া প্রতিবাদ দীর্ঘস্থায়ী হয় না। সিজেপি-কে আজ সেই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তারা কি জবাবদিহিতা চাইবে, নাকি ক্ষমতা?
শেষ কথা
আজকের যন্তর মন্তরের ভিড় আর সোনম ওয়াংচুকের মতো ব্যক্তিত্বদের অনশন আমাদের বলছে, এই ক্ষোভ শুধু পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস বা নির্দিষ্ট কোনো ঘটনার নয়; এটি মেধা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বিশ্বাস হারানোর যন্ত্রণা।
সিজেপি-র সামনে প্রশ্নটি এটা নয় যে, তারা পরবর্তী ‘আম আদমি পার্টি’ হতে পারবে কি না। আসল প্রশ্ন হলো, তারা কি এতটা প্রাজ্ঞ হতে পারবে যে তারা অতীতের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি ভিন্ন ধারার রাজনীতি উপহার দেবে? ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে সিজেপি-র পরিপক্বতাই ঠিক করে দেবে তাদের ভবিষ্যৎ।