চোখের সামনে খুন হন বাবা! চরম শোক ও আর্থিক অনটনকে হারিয়ে আইপিএস হলেন এই কৃষক-পুত্র

ইউপিএসসি (UPSC) সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা মানেই কেবল মেধার লড়াই নয়, এটি আসলে অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং কঠোর পরিশ্রমের এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা। উত্তরপ্রদেশের বজরং প্রসাদ যাদবের (Bajrang Prasad Yadav) কাছে এই পরীক্ষাটি ছিল তাঁর বাবার স্বপ্নপূরণের একমাত্র পথ। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! যে বাবার চোখের স্বপ্নকে বুকে নিয়ে তিনি আইএএস-আইপিএস হওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছিলেন, সেই বাবাকেই নৃশংসভাবে খুন হতে হয়। কিন্তু এই মর্মান্তিক শোক বজরংকে ভেঙে চুরমার করতে পারেনি, বরং তাঁর মনে ‘সিস্টেমে’ ঢুকে সমাজকে ন্যায়বিচার দেওয়ার জেদ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। সমস্ত বাধা এবং চরম আর্থিক অনটনকে জয় করে বজরং আজ একজন সফল আইপিএস অফিসার।

কৃষক পরিবার থেকে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়: বজরঙের শুরুর দিনগুলো
উত্তরপ্রদেশের বস্তি জেলার ধোহাট গ্রামের এক অত্যন্ত সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্ম বজরঙের। নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর সংসারেও ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় ভীষণ মেধাবী ছিলেন তিনি। গ্রামের স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর তিনি এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে গণিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। বজরঙের বাবার স্বপ্ন ছিল, তাঁর ছেলে বড় হয়ে সমাজের জন্য কাজ করবে, এক জন বড় প্রশাসনিক আধিকারিক হবে।

দিল্লিতে প্রস্তুতির মাঝেই বজ্রাঘাত: বাবাকে খুন!
বাবার সেই স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিতেই দেশের রাজধানী দিল্লিতে ইউপিএসসির প্রস্তুতি নিতে যান বজরং। কিন্তু ২০২০ সালে, যখন তিনি প্রিলিমস পরীক্ষার জন্য দিনরাত এক করে পড়াশোনা করছেন, ঠিক তখনই বাড়ি থেকে আসে সেই হাড়হিম করা খবর। জমি বিবাদ বা অন্য কোনও শত্রুতার জেরে তাঁর বাবাকে নির্মমভাবে খুন করা হয়েছে।

এই খবর পাওয়ার পর যে কোনও সাধারণ যুবকের পৃথিবী থমকে যেত। কিন্তু বজরং সেই শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করার এক নজিরবিহীন শপথ নেন। তিনি বুঝতে পারেন, সমাজ থেকে এই ধরনের অপরাধ মুছে ফেলতে এবং সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হলে তাঁকে আইন ও প্রশাসনের অংশ হতেই হবে।

মায়ের অনুপ্রেরণা এবং ভুল শুধরে অবশেষে কেল্লাফতে
বাবার মৃত্যুর পর পরিবারে নেমে আসে চরম আর্থিক অন্ধকার। একদিকে মাথার উপর থেকে অভিভাবকের হাত চলে যাওয়া, অন্যদিকে পড়াশোনার খরচ চালানো—পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত প্রতিকূল। এই কঠিন সময়ে বজরঙের পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়ান তাঁর মা। মায়ের অবিচল বিশ্বাস ও অনুপ্রেরণাই ছিল বজরঙের লড়াইয়ের প্রধান জ্বালানি।

প্রথম দু’বারের চেষ্টায় কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পেলেও বজরং হাল ছাড়েননি। নিজের ভুলগুলো চিহ্নিত করে, আরও কঠোর পরিশ্রমের সাথে প্রস্তুতি চালিয়ে যান। অবশেষে ২০২৩ সালের ইউপিএসসি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় সর্বভারতীয় স্তরে ৪৫৪ তম স্থান অর্জন করে আইপিএস (IPS) অফিসার হিসেবে নিজের নাম খোদাই করেন বজরং। তাঁর এই অবিশ্বাস্য লড়াই আজ দেশের লাখ লাখ পরীক্ষার্থীর কাছে এক অন্যতম অনুপ্রেরণা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *