আকাশে ওড়ে কিন্তু বিমান নয়! মৌমাছির মতো গুনগুন করা এই আশ্চর্য যন্ত্রটি আসলে কীভাবে কাজ করে?

বন্ধুদের আড্ডায় কিংবা চায়ের কাপে ঝড় তোলার মুহূর্তে প্রায়ই একটি প্রশ্ন আমাদের সামনে চলে আসে—’ড্রোন আসলে কী এবং এটি কীভাবে কাজ করে?’ কমবেশি আমরা সবাই এই আধুনিক যন্ত্রটির নাম শুনেছি। দূর আকাশে ডানা ছাড়াই ড্রোনের ওড়ার দৃশ্য এখন বেশ পরিচিত। সাধারণ বিমান আর ড্রোনের কার্যপদ্ধতি মূলত একই রকম হলেও এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো—বিমানে পাইলট থাকে, কিন্তু ড্রোনে কোনো পাইলট থাকে না। অর্থাৎ, ড্রোন হলো সম্পূর্ণ ‘পাইলটবিহীন বিমান’।

তবে অনেকেই আকাশে ওড়া সাধারণ খেলনা বিমানকে ড্রোন ভেবে ভুল করে বসেন। মনে রাখবেন, ড্রোনের প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো এতে অবশ্যই ক্যামেরা থাকতে হবে। খেলনা বিমানে কোনো ক্যামেরা থাকে না। ইংরেজি ‘ড্রোন’ শব্দের অর্থ হলো গুঞ্জন। এই যন্ত্রটি যখন আকাশে ওড়ে, তখন এর পাখার শব্দ হুবহু মৌমাছির গুনগুন শব্দের মতো শোনায় বলেই এর এমন নামকরণ। প্রথম দিকে মূলত ছবি তোলার উদ্দেশ্যে এটি তৈরি করা হলেও, বর্তমানে সিনেমার শুটিং, পণ্য ডেলিভারি থেকে শুরু করে আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রেও ড্রোনের ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে।

ডেইলিয়ান্টের পাঠকদের জন্য আজ ড্রোনের কার্যপদ্ধতি ও এর ভেতরের জটিল প্রযুক্তির সহজ বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো:

ড্রোন কীভাবে কাজ করে?
যেকোনো ড্রোন মূলত UAV বা ‘Unmanned Aerial Vehicle’ (পাইলটবিহীন আকাশযান) সিস্টেমে কাজ করে। এটি প্রধানত দুই প্রকার:

সাধারণ UAV: এগুলো সাধারণ বা বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত হয়। এতে মূলত একটি ক্যামেরা, প্রপেলার বা পাখা এবং কিছু সেন্সর থাকে, যা একে পথ চলতে সাহায্য করে।

সামরিক UAV: এটি যুদ্ধের কাজে ব্যবহৃত অত্যন্ত শক্তিশালী ড্রোন। এতে ককপিট (পাইলটহীন), স্পাই ক্যামেরা, লেজার, জিপিএস, সেন্সর ও লাইটিং সিস্টেমের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি থাকে। এই ড্রোনগুলোর কার্যক্ষমতা সামনের দিকে বেশি থাকায় এরা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে পারে এবং এদের ওড়ার জন্য রানওয়ের প্রয়োজন হয়।

যেকোনো ড্রোনের মূলত দুটি অংশ থাকে—ড্রোন নিজে এবং এর কন্ট্রোল সিস্টেম। গ্রাউন্ড কন্ট্রোলার নিচে থেকে যে নির্দেশ দেন, তা স্যাটেলাইট বা উপগ্রহের মাধ্যমে ড্রোনের কন্ট্রোল অংশে পৌঁছায় এবং ড্রোন সেই অনুযায়ী কাজ করে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে সময় লাগে মাত্র ২ সেকেন্ড!

১. রাডার পজিশন ও স্বয়ংক্রিয় প্রত্যাবর্তন
সামরিক ড্রোনে রাডার পজিশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর সাহায্যে ড্রোনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আকাশে নিজের অবস্থান নির্ণয় করতে পারে এবং গ্রাউন্ড কন্ট্রোলারকে সিগন্যাল পাঠায়। এই প্রযুক্তিতে ‘Command Back to Home System’ নামে একটি বিশেষ অপশন থাকে। এর ফলে ড্রোনটি আকাশে যেখানেই থাকুক না কেন, রিমোট কন্ট্রোল ছাড়াই একদম নিখুঁতভাবে নিজের আগের অবস্থানে (যেখান থেকে উড়েছিল) ফিরে আসতে পারে।

২. জাইরো পজিশন সিস্টেম (Gyro Positioning System)
এই সিস্টেমের মূল কাজ হলো নিজের এবং চারপাশের সবকিছুর অবস্থান নিখুঁতভাবে মেপে নেওয়া। এই জাইরোস্কোপ প্রযুক্তির কারণেই একটি ড্রোন আকাশে স্থির থাকতে পারে এবং সঠিকভাবে ভূমিতে ল্যান্ডিং (অবতরণ) করতে পারে। জাইরো পজিশন সিস্টেম চালু হওয়া মাত্রই প্রথমে উত্তর মেরু খুঁজে নেয়। এরপর আশেপাশে থাকা অন্য কোনো ড্রোন, বিমান বা অন্য কোনো বস্তুর অবস্থান শনাক্ত করে। সামরিক ড্রোনে এই প্রযুক্তি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়।

৩. ফ্লাইজোন প্রযুক্তি (Fly Zone Technology)
আপনার মনে কি কখনো প্রশ্ন জেগেছে যে, আকাশে এত বিমান ওড়ে, তাও কেন বিমানের সাথে ড্রোনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটে না? এর পেছনে রয়েছে ফ্লাইজোন প্রযুক্তির ম্যাজিক। এই প্রযুক্তিতে যে এলাকায় ড্রোন ওড়ানো হচ্ছে, সেই এলাকার বাণিজ্যিক বিমান চলাচলের সম্পূর্ণ সময়সূচি (Timetable) ড্রোনের সিস্টেমে আগে থেকেই ইনপুট করা থাকে। ফলে ড্রোনটি নিজে থেকেই বিমান চলাচলের পথ থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখে। এছাড়া এতে ফার্মওয়্যার ব্যবহার করে ‘AOB’ নির্ণয় করার প্রযুক্তি রয়েছে, যা ড্রোন প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলো কঠোর গোপনীয়তার কারণে প্রকাশ করে না।

৪. এফপিভি প্রযুক্তি (FPV Technology)
এফপিভি-এর পূর্ণ রূপ হলো ‘First Person View’। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ড্রোনে থাকা ক্যামেরাটি মাটিতে অবস্থানরত যেকোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর নিখুঁত ও লাইভ তথ্য কন্ট্রোলারের স্ক্রিনে পাঠাতে সক্ষম। তবে এই প্রযুক্তির একটি সীমাবদ্ধতা হলো, এটি ঘন জঙ্গল বা অতিরিক্ত জনবসতিপূর্ণ এলাকায় শতভাগ সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। আর এই কারণেই বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীরা এখন এফপিভি প্রযুক্তির আরও উন্নত ও আধুনিক বিকল্প নিয়ে গবেষণা করছেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *