এভারেস্টের এক পারমিটেই কোটি কোটি টাকার বন্যা! নেপালের এই বিশাল আয়ের রহস্য জানলে চমকে যাবেন

বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট বরাবরই সমস্ত রোমাঞ্চপ্রেমী ও পাহাড় পাগল মানুষের কাছে এক পরম আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। তবে নেপালের কাছে এই পর্বত শুধু বরফে ঢাকা কোনো শৃঙ্গ নয়, বরং দেশটির সামগ্রিক অর্থনীতির সবথেকে বড় চালিকাশক্তি। প্রতি বছর এই হিমালয়ের বুক চিরে আসা সৌন্দর্য এবং পর্যটন শিল্প থেকেই শত শত কোটি রুপি আয় করে নেপাল, যা তাদের জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান মেরুদণ্ড। সাম্প্রতিক ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের পর্যটন খাতের বিভিন্ন তথ্য ও পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, নেপালের পর্যটন শিল্প ক্রমাগত নতুন সাফল্যের শিখর স্পর্শ করছে।

এভারেস্টের পারমিটেই রেকর্ড কোটি কোটি টাকার রাজস্ব
সারা পৃথিবী থেকে হাজার হাজার মানুষ প্রতি বছর নেপালের দুর্গম পর্বতশৃঙ্গগুলো জয় করার স্বপ্ন নিয়ে ছুটে আসেন। যার মধ্যে কেবল মাউন্ট এভারেস্ট থেকেই যে পরিমাণ রাজস্ব আদায় হয়, তা সত্যিই অবাক করার মতো। বিশেষ করে ২০২৬ সালের বসন্তকালীন আরোহণ মৌসুমে নেপাল সরকার শুধুমাত্র এভারেস্টের পারমিট বিক্রি করেই রেকর্ড ৭০ লক্ষ মার্কিন ডলার বা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় কোটিরও বেশি টাকা আয় করেছে। এই নির্দিষ্ট সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে প্রায় ৪৯৪টি পারমিট ইস্যু করা হয়েছিল। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ২০২৫ সালে একরত্তি পর্বত পর্যটন থেকে সরকারের রয়্যালটি আয় আনুমানিক ১.২৬ বিলিয়ন নেপালি রুপিতে গিয়ে ঠেকেছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩৬.৪ শতাংশের এক বিশাল উল্লম্ফন।

পর্যটকদের ভিড়ে সিংহভাগই ভারতীয়
নেপালে আগত পর্যটকদের সামগ্রিক পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায় যে, সেখানে বিদেশি পর্যটকদের সংখ্যাই সর্বাধিক। ২০২৫ সালে আনুমানিক ১১.৬২ লক্ষ বিদেশি পর্যটক নেপাল ভ্রমণ করেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১.৩ শতাংশ বেশি। তবে এই পর্যটন বাজারে সবচেয়ে বড় চমক ও আধিপত্য রয়েছে ভারতীয়দের। ২০২৫ সালে মোট পর্যটকের প্রায় ২৫ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ২৯.২ লক্ষ ভারতীয় পর্যটক নেপালে পা রেখেছিলেন। ভারত ছাড়াও আমেরিকা, চিন, যুক্তরাজ্য এবং বাংলাদেশের পর্যটকরাও নেপালের অর্থনীতি চাঙ্গা করতে বড় ভূমিকা পালন করছেন।

দিনের সংখ্যা বাড়লেও পর্যটকদের মাথাপিছু খরচ কমল
পর্যটন থেকে সামগ্রিক আয়ের নিরিখে ২০২৫ সালে নেপাল প্রায় ৮৭.৩৭ বিলিয়ন নেপালি রুপি ঘরে তুলেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৪.৭৭ শতাংশ বেশি। তবে এবছর পর্যটকদের আচরণে একটি ব্যতিক্রমী ও আকর্ষণীয় প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। তথ্য বলছে, নেপালে পর্যটকদের গড় ভ্রমণের সময়কাল ১৩.৩ দিন থেকে বেড়ে সোজা ১৬.৩৪ দিনে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি দিন ধরে দেশটিতে কাটাচ্ছেন।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তাঁদের মাথাপিছু গড় দৈনিক খরচ এর আগের ৪০.৮৪ ডলার থেকে কমে ৩৩.০৯ ডলারে নেমে এসেছে। সহজ কথায়, পর্যটকরা এখন নেপালে অনেক বেশি সময় ধরে ছুটি কাটাচ্ছেন, কিন্তু দৈনন্দিন খরচের হাত কিছুটা কমিয়ে দিয়েছেন।

শক্তিশালী পরিকাঠামো ও অভ্যন্তরীণ পর্যটনের উত্থান
বিদেশি পর্যটকদের এই বিপুল ঢল সামাল দিতে এবং পর্যটন শিল্পকে আরও সুসংগঠিত করতে নেপাল সরকার তাদের পরিকাঠামোয় ব্যাপক জোর দিয়েছে। ২০২৫ সালের অফিশিয়াল তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে নেপালে ২২২টি লাক্সারি বা তারকা হোটেল রয়েছে। পাশাপাশি পর্যটকদের সুবিধার্থে দেশজুড়ে ৫,০৯৯টি রেজিস্টার্ড ট্র্যাভেল এজেন্সি এবং ৩,৩৩২টি ট্রেকিং এজেন্সি অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে কাজ করে চলেছে।

শুধু বিদেশিরাই নন, নেপালের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ পর্যটনও এখন দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশটির ২০২৫ সালের অভ্যন্তরীণ পর্যটন সমীক্ষার রিপোর্ট অনুযায়ী, একাই জাতীয় জিডিপিতে (GDP) প্রায় ২.৬৫ শতাংশ বড় অবদান রেখেছে স্থানীয় পর্যটন। সব মিলিয়ে হিমালয়ের কোলে পর্যটনের এই রমরমা বাজারই এখন নেপালের অর্থনীতির মূল চাবিকাঠি হয়ে উঠেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *