মেলোনিকে দেওয়া মোদীর সেই ‘মেলোডি’র জন্ম হয়েছিল কীভাবে? জানুন ১৯৮৩ সালের সেই আইকনিক চকলেটের অজানা ইতিহাস!

৯০-এর দশকে ভারতীয় টেলিভিশনের পর্দা কাঁপানো সেই বিখ্যাত বিজ্ঞাপনটি বোধহয় কেউই ভোলেননি। যেখানে অত্যন্ত সহজ ও মজার ছলে প্রশ্ন করা হতো: “মেলোডি এত চকোলেটি কেন?” আর ওপাশ থেকে উত্তর আসত, “মেলোডি খাও, নিজেই জানো।” যুগের পর যুগ ধরে ছোট-বড় সবার মন জয় করা পার্লের সেই আইকনিক ‘মেলোডি’ টফি আবারও বিশ্বমঞ্চের লাইমলাইটে। সৌজন্যে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি। ইতালির সরকারি সফরে গিয়ে মোদী তাঁর বান্ধবী মেলোনিকে এক প্যাকেট ‘মেলোডি’ উপহার দিতেই হু হু করে ভাইরাল হয়ে গেছে চার দশকের পুরনো এই চকলেটের ইতিহাস।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড়ের গতিতে ভাইরাল ভিডিও
সম্প্রতি নেটপাড়ায় একটি ভিডিও দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী পরম আন্তরিকতায় ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির হাতে এক প্যাকেট ‘মেলোডি’ টফি তুলে দিচ্ছেন। ভার্চুয়াল দুনিয়ায় এই দুই রাষ্ট্রপ্রধানের জুটিকে ভক্তরা ভালোবেসে ‘মেলোডি’ (Melodi) বলে ডাকেন। আর সেই রসায়নকে ছুঁয়েই মোদীর এই চমৎকার উপহার কোটি কোটি ভারতীয়র শৈশবের স্মৃতিকে তাজা করে তুলেছে। ওপরের চটচটে ক্যারামেলের স্তর আর ভেতরে ঠাসা চকলেটের পুর— এই যুগলবন্দী কয়েক দশক ধরে ভারতীয়দের রসনাতৃপ্তি ঘটিয়ে আসছে।
১৯৮৩ সালে শুরু হয়েছিল মেলোডির সফর
ভারতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় মিষ্টান্ন প্রস্তুতকারক সংস্থা ‘পার্লে প্রোডাক্টস’ (Parle Products) ১৯৮৩ সালে প্রথম মেলোডি টফি বাজারে আনে। স্বাদের অভিনবত্ব এবং নরম ক্যারামেলের আবরণের জন্য এটি বাজারে আসবামাত্রই শিশু থেকে বুড়ো— সকলের হৃদয়ে এক বিশেষ স্থান করে নেয়। তবে এর তুমুল জনপ্রিয়তার পেছনে স্বাদের পাশাপাশি আরেকটি বড় অস্ত্র ছিল এর আইকনিক ও কালজয়ী বিজ্ঞাপন।
কে তৈরি করে এই মেলোডি? জানুন পার্লের ইতিহাস
মেলোডির জন্মদাতা সংস্থা পার্লে প্রোডাক্টস-এর ইতিহাস কিন্তু বেশ দীর্ঘ। ১৯২৯ সালে অবিভক্ত ভারতের মুম্বাইয়ের ‘ভিলে পার্লে’ এলাকায় চৌহান পরিবারের হাত ধরে এই কোম্পানির পথচলা শুরু হয়। শুরুতে তারা কেবল লজেন্স এবং টফি তৈরি করত। পরবর্তীতে, ১৯৩৯ সালে কোম্পানিটি বিস্কুটের ব্যবসায় পা রাখে। আজ পার্লে ভারতের বৃহত্তম বিস্কুট ও কনফেকশনারি ব্র্যান্ডগুলোর অন্যতম, যাদের তৈরি ‘পার্লে-জি’ (Parle-G) বিস্কুট ভারতকে বিশ্বমঞ্চে এক আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
ব্যবসায় জোয়ার, কিন্তু মুনাফায় ধাক্কা!
সম্প্রতি প্রকাশিত নিয়ন্ত্রক সংস্থার আর্থিক নথি অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে পার্লে প্রোডাক্টস-এর ব্যবসায়িক পরিধি বা পরিচালন আয় (Operational Revenue) ৮.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৫,৫৬৮ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। কোম্পানির মোট আয় দাঁড়িয়েছে ১৬,১৯০ কোটি টাকারও বেশি। তবে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি ও বাজার প্রতিযোগিতার কারণে কোম্পানির নিট মুনাফায় বড়সড় ধাক্কা লেগেছে। পার্লের লাভ প্রায় ৩৯ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৯৭৯ কোটি টাকায় এসে ঠেকেছে।
“মেলোডি খাও, নিজেই জানো”— যেভাবে তৈরি হয়েছিল এই সুপারহিট জিঙ্গেল
মেলোডিকে ব্র্যান্ড থেকে ইমোশন বা আবেগে পরিণত করার পেছনে অবদান ছিল ‘এভারেস্ট’ (Everest) নামক একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার। আশির দশকে তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল মেলোডিকে বাজারের সবচেয়ে চকোলেটময় টফি হিসেবে তুলে ধরার।
সংস্থার ক্রিয়েটিভ টিম তখন এক মাস্টারস্ট্রোক দেয়। তারা এমন একটি সংলাপ তৈরি করে যা মানুষের মনে কৌতূহল জাগিয়ে তুলবে। প্রশ্ন করা হয়, “মেলোডি এত চকোলেটি কিউ হ্যায়?” আর উত্তর আসে, “মেলোডি খাও, খুদ জান যাও।” এই সাধারণ লাইনটি এতটাই সাইকোলজিক্যাল হিট ছিল যে মানুষ সত্যি সত্যিই এর উত্তর খুঁজতে দোকান থেকে মেলোডি কিনে খেতে শুরু করে।
বহু বছর পর, বলিউডের ব্লকবাস্টার সিনেমা ‘ছিছোড়ে’-তেও এই আইকনিক সংলাপটিকে নতুনভাবে ট্রিব্যুট দেওয়া হয়েছিল। আজ প্রধানমন্ত্রী মোদীর হাত ধরে সেই দেশী চকলেটের স্বাদ ও নস্টালজিয়া পৌঁছে গেল সুদূর ইতালির হোয়াইট হাউসেও।