‘আটা-সাতা’ প্রথার বলি গৃহবধূ! বিবাহবিচ্ছেদের মামলায় ঐতিহাসিক রায় দিয়ে হাইকোর্ট কী বলল?

দাম্পত্য কলহ বা নিষ্ঠুরতার মামলায় এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী রায় দিল রাজস্থান হাইকোর্ট। পারিবারিক আদালতের একটি রায়কে সম্পূর্ণ খারিজ করে বিকানেরের এক নির্যাতিতা মহিলাকে বিবাহবিচ্ছেদের (Divorce) অনুমতি দিয়েছে উচ্চ আদালত। রায় দেওয়ার সময় হাইকোর্ট স্পষ্ট জানিয়েছে, কোনো ফৌজদারি মামলার মতো দাম্পত্য বিবাদের ক্ষেত্রে নিষ্ঠুরতা ‘যুক্তিসঙ্গত সন্দেহের ঊর্ধ্বে’ গিয়ে প্রমাণ করার প্রয়োজন নেই। বিচারপতি অরুণ মঙ্গা এবং বিচারপতি সুনীল বেনিওয়ালের ডিভিশন বেঞ্চ পর্যবেক্ষণ করেছে যে, বৈবাহিক বিরোধের নিষ্পত্তি কঠোর ফৌজদারি আইনের দাড়িপাল্লায় নয়, বরং ‘সম্ভাবনার প্রাধান্য’ (Preponderance of Probabilities) নীতির ওপর ভিত্তি করে হওয়া উচিত।

‘আটা-সাতা’ প্রথাকে তীব্র ধিক্কার হাইকোর্টের
মামলার শুনানির সময় রাজস্থান হাইকোর্টের যোধপুর বেঞ্চ রাজ্যের শতবর্ষ প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ‘আটা-সাতা’ (Aata-Sata) বিবাহ প্রথার তীব্র নিন্দা ও সমালোচনা করেছে। আদালত এই প্রথাকে ‘আইনগত ও নৈতিকভাবে দেউলিয়া’ বলে বর্ণনা করেছে। কঠোর ভাষায় বিচারপতিরা বলেন, এটি আদতে ‘মানব জীবন জড়িয়ে থাকা একটি অমানবিক ও নিষ্ঠুর বিনিময় ব্যবস্থা’ ছাড়া আর কিছুই নয়।

কী এই ‘আটা-সাতা’ প্রথা?
এটি রাজস্থানের একটি প্রাচীন কুপ্রথা বা ‘বিনিময় প্রথা’, যেখানে দুটি পরিবার নিজেদের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে পারস্পরিক বিয়ের চুক্তি করে। অর্থাৎ, এক বাড়ির মেয়ে অন্য বাড়িতে বিয়ে হলে, পাল্টা সেই বাড়ির মেয়েকে এই বাড়ির ছেলের সাথে বিয়ে করতে হয়। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, এই লেনদেনের ঐতিহ্যে অনেক সময় নাবালিকা কন্যাসন্তানদেরও জোরপূর্বক শামিল করা হয়।

কী নিয়ে বিবাদের সূত্রপাত?
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, আপিলকারী ওই মহিলার বিয়ে হয়েছিল ২০১৬ সালের ৩১শে মার্চ, বিকানেরের হিন্দু রীতি মেনে। একই দিনে, ‘আটা-সাতা’ প্রথার অংশ হিসেবে ওই মহিলার স্বামীর নাবালিকা বোনের সাথে বিয়ে দেওয়া হয় মহিলার নিজের ভাইয়ের। কিন্তু বিপত্তি ঘটে কয়েক বছর পর। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর ওই তরুণী (স্বামীর বোন) এই জোরপূর্বক বাল্যবিবাহ মেনে নিতে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। আর এর জেরেই শুরু হয় দুই পরিবারের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত।

নির্যাতিতা মহিলার অভিযোগ, এই ঘটনার পর থেকেই শ্বশুরবাড়িতে তাঁর ওপর নেমে আসে অবর্ণনীয় অত্যাচার। যৌতুকের দাবিতে প্রতিনিয়ত তাঁকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো। ২০২০ সালের ১৯শে মার্চ, তাঁকে তাঁর নাবালিকা কন্যাসন্তানসহ ঘাড় ধাক্কা দিয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। বাধ্য হয়ে তিনি স্বামী ও শ্বশুরের বিরুদ্ধে যৌতুক নির্যাতনসহ একাধিক ধারায় এফআইআর (FIR) দায়ের করেন, যার ভিত্তিতে পুলিশ চার্জশিটও জমা দেয়। পাল্টা চাল হিসেবে স্বামীও ওই মহিলার বাবা ও ভাইয়ের বিরুদ্ধে পুলিশে শান্তিশৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ ঠুকে দেন।

পারিবারিক আদালতের ‘গুরুতর ভুল’
বিবাদের জেরে চরম অতিষ্ঠ হয়ে ওই মহিলা বিবাহবিচ্ছেদের জন্য বিকানেরের পারিবারিক আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। তবে, গত ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ তারিখে পারিবারিক আদালত মহিলার আবেদনটি খারিজ করে দেয়। আদালত স্বামীর এই যুক্তি লুফে নেয় যে, মহিলাটি স্বেচ্ছায় ঘর ছেড়েছেন এবং স্বামীর বোন বিয়ে মেনে না নেওয়ায় শ্বশুরবাড়ির ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই এই মামলা করা হয়েছে।

পারিবারিক আদালতের এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে আপিল করেন ভুক্তভোগী। হাইকোর্ট সমস্ত নথি খতিয়ে দেখে সাফ জানায়, ‘আটা-সাতা’ প্রথা থেকে তৈরি হওয়া একটি বাইরের পারিবারিক বিবাদকে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার দাম্পত্য নিষ্ঠুরতার সাথে গুলিয়ে ফেলে নিম্ন আদালত একটি ‘গুরুতর ভুল’ করেছে।

ভরণপোষণ ত্যাগ করে মুক্তি চাইলেন মহিলা
শুনানির এক পর্যায়ে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। নির্যাতিতা মহিলা আদালতের সামনে হাতজোড় করে জানান, তিনি শুধু মানসিক শান্তি চান। মুক্তির জন্য তিনি তাঁর বর্তমান ও ভবিষ্যতের সমস্ত প্রকার খোরপোশ বা ভরণপোষণের (Alimony) দাবি ত্যাগ করতেও রাজি আছেন। মহিলার এই মানসিক পরিস্থিতি এবং তাঁর ওপর হওয়া অন্যায়ের গভীরতা বিবেচনা করে রাজস্থান হাইকোর্ট অবিলম্বে তাঁর বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন মঞ্জুর করার আদেশ দেয়।