চীন-পাকিস্তানের প্লাস্টিক মাইনও ধরবে ভারতীয় সেনা! ২৯০ কোটির এই এক প্রযুক্তিতেই উবে যাবে আইইডি-র ভয়!

সীমান্ত সুরক্ষা ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে এবার এক যুগান্তকারী প্রযুক্তি যুক্ত করতে চলেছে ভারতীয় সেনাবাহিনী। এবার আর শুধু লোহা বা ধাতু নয়; মাটি, পাথর, কাঠ, সিরামিক এমনকি প্লাস্টিকের নিচে লুকিয়ে রাখা গোপন বিস্ফোরকও চোখের পলকে ধরে ফেলবে জওয়ানরা। শত্রুদেশ ও সন্ত্রাসবাদীদের নিত্যনতুন চাল ব্যর্থ করতে ভারতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রক সেনাবাহিনীর জন্য ৩৮৬টি নতুন প্রজন্মের, ‘দ্বৈত-প্রযুক্তির’ (Dual-Technology) মাইন ডিটেক্টর কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর জন্য প্রায় ২৯০ কোটি টাকার একটি বড়সড় টেন্ডারও জারি করা হয়েছে।

কেন হঠাৎ এই আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োজন পড়ল?
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ ও নাশকতার ধরন বদলেছে। আফগানিস্তান ও ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, প্রথাগত ধাতব ল্যান্ডমাইনের বদলে সন্ত্রাসী ও শত্রুভাবাপন্ন দেশগুলো এখন প্লাস্টিক বা অন্যান্য অধাতব পদার্থের আইইডি (IED) ও মাইন বেশি ব্যবহার করছে। ভারতীয় সেনাবাহিনী বর্তমানে ‘শিবেল’ (Schiebel) এবং ‘মেটেক্স’ (Metex)-এর মতো যে মেটাল ডিটেক্টরগুলো ব্যবহার করে, সেগুলোর ক্ষমতা শুধু মাটির নিচে থাকা ধাতু শনাক্ত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ফলে অধাতব বোমাগুলো খুঁজে পেতে জওয়ানদের বেশ বেগ পেতে হতো।

জম্মু-কাশ্মীর এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চালানোর সময় ভারতীয় বাহিনীকে বারবার এই ধরনের প্লাস্টিক বা সিরামিক আইইডি-র মুখোমুখি হতে হয়েছে। এছাড়া চীন ও পাকিস্তান সীমান্ত বরাবর ল্যান্ডমাইনের স্থায়ী হুমকি তো রয়েছেই। এই অদৃশ্য বিপদ থেকে জওয়ানদের প্রাণ বাঁচাতে এবং নিখুঁত অপারেশন চালাতেই এই আধুনিক প্রযুক্তির অন্তর্ভুক্তি।

কীভাবে কাজ করবে এই জাদুকরী ‘দ্বৈত প্রযুক্তি’?
নতুন এই মাইন ডিটেক্টর সিস্টেমে প্রথাগত ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক মেটাল ডিটেকশনের পাশাপাশি যুক্ত করা হচ্ছে অত্যাধুনিক গ্রাউন্ড পেনিট্রেটিং রাডার (GPR) অথবা ইনফ্রারেড (IR) প্রযুক্তি।

দ্বৈত অ্যাকশন: পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে এই ডিভাইসের দুটি প্রযুক্তি একসাথে বা আলাদা আলাদাভাবে ব্যবহার করা যাবে।

দুর্গম অঞ্চলেও কার্যকর: বরফে ঢাকা পর্বত, রাজস্থানের মরুভূমি, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জলাভূমি কিংবা কাশ্মীরের পাহাড়ি এলাকা—সব ধরনের ভূখণ্ডেই এটি সমানভাবে কাজ করবে।

ছোট থেকে ছোট বোমাও রেহাই পাবে না!
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি বিবরণী অনুযায়ী, এই ডিভাইসটি মাত্র ৬ সেন্টিমিটার ব্যাস এবং ৪ সেন্টিমিটার উচ্চতার অত্যন্ত ছোট বিস্ফোরকও অনায়াসে ধরে ফেলবে। শুকনো মাটি ও বালিতে প্রায় ১২ সেন্টিমিটার গভীর পর্যন্ত এবং বরফ, কাদা বা লবণাক্ত এলাকায় ১০ সেন্টিমিটার গভীরতায় লুকিয়ে রাখা মাইনের অবস্থান এটি নির্ভুলভাবে জানিয়ে দেবে।

হাড়কাঁপানো ঠান্ডা থেকে তীব্র গরম: সব আবহাওয়ায় সেরা
ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাজের পরিবেশের কথা মাথায় রেখেই এটি ডিজাইন করা হয়েছে।

তাপমাত্রা: এটি -১০° সেলসিয়াস থেকে শুরু করে +৪২° সেলসিয়াস পর্যন্ত চরম তাপমাত্রায় অনায়াসে কাজ করতে পারে।

সহজ ব্যবহার: জওয়ানরা চাইলে দাঁড়িয়ে, হাঁটু গেড়ে বা মাটিতে শুয়েও এটি ব্যবহার করতে পারবেন।

ওজন: ব্যাটারি ও পুরো সিস্টেমসহ এর কার্যকরী ওজন ৮ কিলোগ্রামেরও কম। ফলে দীর্ঘসময় ধরে এটি বহন করতে জওয়ানদের কোনো ক্লান্তি আসবে না।

অ্যালার্ম: বিপদ শনাক্ত হওয়ামাত্রই এটিতে একই সাথে শব্দ (Audio) এবং স্ক্রিনে সংকেত (Visual Alarm) দেখা যাবে।

কবে নাগাদ আসছে এই প্রযুক্তি?
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যে সংস্থাকে এই কাজের দায়িত্ব দেওয়া হবে, তাদের আগামী ৫৪০ দিনের (প্রায় দেড় বছর) মধ্যে ৩৮৬টি ইউনিটই সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করতে হবে।

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সরঞ্জামগুলো হাতে এলে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ‘কমব্যাট ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিট’-এর ক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যাবে। চীন সংলগ্ন প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা (LAC), পাকিস্তান সীমান্ত (LoC) এবং দেশের অভ্যন্তরে মাওবাদী ও জঙ্গি দমন অভিযানে এই প্রযুক্তি ভারতীয় সেনাদের জন্য এক অভেদ্য সুরক্ষা ঢাল বা ‘সুরক্ষা কবচ’ হিসেবে কাজ করবে।