টোল প্লাজা পার হতেই গায়েব আসল নম্বর! চন্দ্রনাথ রথ হত্যাকাণ্ডে সিবিআই-এর জালে ৩, ফাঁস হলো হাড়হিম করা ছক

রাজ্যের হেভিওয়েট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তথা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর আপ্তসহায়ক (PA) চন্দ্রনাথ রথ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নেমে একের পর এক বিস্ফোরক ও হাড়হিম করা তথ্য হাতে পেল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই (CBI)। এই হাই-প্রোফাইল খুনের মামলায় ইতিমধ্যেই তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছেন গোয়েন্দারা। ধৃতদের ম্যারাথন জেরা করতেই সামনে এসেছে পেশাদার অপরাধীদের মতো নিখুঁত পরিকল্পনার এক নীল নকশা, যা দেখে তাজ্জব বনে যাচ্ছেন খোদ তদন্তকারীরাও।

সিবিআই সূত্রে খবর, চন্দ্রনাথ রথকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার এই গোটা অপারেশনের পেছনে রয়েছে আন্তঃরাজ্য এক অপরাধ চক্র, যার সুতো বাঁধা রয়েছে প্রতিবেশী রাজ্য ঝাড়খণ্ডের সঙ্গে।

১ লক্ষ টাকার সুপারি ও নম্বর প্লেট বদলের খেলা
সিবিআই তদন্তে জানতে পেরেছে, এই হত্যাকাণ্ডের জন্য ঝাড়খণ্ড থেকে একটি নিসান মাইক্রা গাড়ি উত্তর ২৪ পরগনার বারাসত পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার জন্য মোটা অঙ্কের সুপারি বা চুক্তি করা হয়েছিল। ধৃতদের মধ্যে অন্যতম মায়াঙ্ক নামের এক যুবক জেরায় স্বীকার করেছে, শুধুমাত্র ওই নির্দিষ্ট গাড়িটি সঠিক গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার জন্যই তাকে নগদ ১ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছিল। এই পুরো লজিস্টিক সাপোর্টের নেপথ্যে রয়েছেন ঝাড়খণ্ডের এক প্রভাবশালী ব্যক্তি, যাঁর খোঁজে এখন বিভিন্ন রাজ্যে চিরুনি তল্লাশি চালাচ্ছে সিবিআই।

তদন্তে আরও জানা গেছে, মধ্যমগ্রামে খুনের ঘটনার দিন অভিযুক্তরা এই নিসান মাইক্রা গাড়িতে করেই অপারেশন চালাতে এসেছিল। তবে পুলিশের নজর এড়াতে এবং গাড়ির আসল পরিচয় গোপন রাখতে আগে থেকেই তৈরি ছিল এক চতুর পরিকল্পনা। হাওড়ার নিবেদিতা টোল প্লাজায় পৌঁছানোর ঠিক আগে গাড়িটি রাস্তার এক পাশে থামানো হয়। সেখানেই খুলে ফেলা হয় ঝাড়খণ্ডের আসল নম্বর প্লেট এবং তার বদলে লাগিয়ে দেওয়া হয় শিলিগুড়ি আরটিও (RTO)-তে নথিভুক্ত অন্য একটি গাড়ির ভুয়া নম্বর প্লেট।

ডিজিটাল পেমেন্ট ও বক্সারে পলায়ন
ধৃত মায়াঙ্ক সিবিআই-কে জানিয়েছে, টোল প্লাজা পার হওয়ার আগেই তারা পুরনো নম্বর প্লেটটি একটি নির্জন জায়গায় ফেলে দিয়েছিল। সিবিআই আধিকারিকরা মায়াঙ্ককে সাথে নিয়ে ইতিমধ্যেই অপরাধের পুরো রুট ম্যাপ পুনর্নির্মাণ (Reconstruction) করেছেন।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, বারাসতে পৌঁছানোর পর মায়াঙ্ককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল ১১ নম্বর রেলগেটের কাছে গাড়িটি রেখে চম্পট দিতে। সেই মতো কাজ সেরে সে প্রথমে বাসে করে কলকাতা বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকায় যায় এবং পরে একটি ক্যাব ধরে হাওড়া স্টেশনে পৌঁছায়। সেখান থেকে সোজা ট্রেনে চেপে বিহারের বক্সারে পালিয়ে যায় সে। তবে চতুর অপরাধী হলেও একটি ভুল সে করে বসেছিল; টোল প্লাজায় ডিজিটাল পদ্ধতিতেই টোলের টাকা মেটানো হয়েছিল, যার ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট ট্র্যাক করেই সিবিআই তার অবধি পৌঁছাতে সক্ষম হয়।

বাংলায় এসেছিল আরও এক রহস্যময় গাড়ি!
চন্দ্রনাথ রথ খুনের তদন্ত যত এগোচ্ছে, রহস্যের গভীরতা তত বাড়ছে। সিবিআই-এর হাতে আসা নতুন তথ্য অনুযায়ী, খুনের দিন ঝাড়খণ্ড থেকে শুধু ওই নিসান মাইক্রাই নয়, আরও একটি চারচাকা গাড়ি বাংলায় প্রবেশ করেছিল। সেই দ্বিতীয় গাড়িতে থাকা তিন রহস্যময় আরোহীর পরিচয় এখনও জানা যায়নি।

বর্তমানে সিবিআই হেফাজতে থাকা অন্য দুই ধৃত ভিকি এবং রাজ সিং কি ওই গাড়িতেই ছিলেন, নাকি এই ঘটনার পেছনে আরও বড় কোনো চক্র বা নতুন কোনো শার্প শুটার জড়িত রয়েছে, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। গোয়েন্দাদের মূল ফোকাস এখন ঝাড়খণ্ডের সেই রহস্যময় ব্যক্তির দিকে, যার নির্দেশে গাড়ি সরবরাহ করা হয়েছিল। তিনি কেবলই একজন কুরিয়ার নাকি এই গোটা খুনের নেপথ্যের আসল মাস্টারমাইন্ড—তা জানতে মরিয়া কেন্দ্রীয় সংস্থা।