এক ধাক্কায় ৩ টাকা বাড়ল পেট্রোল-ডিজেলের দাম! কিন্তু সব রাজ্যে কেন এক থাকে না দর? আসল ‘খেলা’ বুঝে নিন

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের (Crude Oil) লাগাতার মূল্যবৃদ্ধির জেরে এবার বড়সড় ধাক্কা খেল মধ্যবিত্তের পকেট। দেশজুড়ে পেট্রোল ও ডিজেল উভয়ের দামই এক ধাক্কায় লিটার প্রতি ৩ টাকা করে বাড়িয়ে দিয়েছে সরকার। এই ঘোষণার পর স্বাভাবিকভাবেই দেশের বিভিন্ন মহানগর ও জেলাগুলোতে জ্বালানির দাম ভিন্ন ভিন্ন হারে আকাশছোঁয়া হয়ে উঠেছে। তবে দাম বাড়ার এই খবরের মাঝেই একটা প্রশ্ন সাধারণ মানুষের মনে প্রায়শই ঘুরপাক খায়—একই দেশে, একই কোম্পানির পেট্রোল বা ডিজেলের দাম বিভিন্ন রাজ্যে আলাদা কেন হয়? এর পেছনে আসল ‘খেলা’ কোথায়? চলুন, সোজা ভাষায় অঙ্কটা বুঝে নেওয়া যাক।

দামের তারতম্যের আসল কারণ: রাজ্য সরকারের কর (VAT)
পেট্রোল ও ডিজেলের দাম রাজ্যভেদে আলাদা হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো ‘ভ্যাট’ (VAT) বা মূল্য সংযোজন কর (Value Added Tax)।

জ্বালানি তেলের ওপর মূলত দু’ধরণের কর নেওয়া হয়। প্রথমত, কেন্দ্রীয় সরকার এর ওপর বসায় নির্দিষ্ট ‘আবগারি শুল্ক’ (Excise Duty), যা সারা দেশের জন্য সমান। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি রাজ্য সরকার নিজেদের আর্থিক প্রয়োজন ও বিবেচনার ভিত্তিতে এর ওপর চাপায় ‘ভ্যাট’ (VAT)। এই ভ্যাটের হারের পার্থক্যের কারণেই রাজ্য জুড়ে জ্বালানির দামে আকাশ-পাতাল তফাত তৈরি হয়। অনেক রাজ্য শতাংশের ভিত্তিতে (Percentage wise) ভ্যাট আরোপ করে, আবার কিছু রাজ্য প্রতি লিটারে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের কর এবং রোড সেস (Road Cess) যোগ করে। ফলে যে রাজ্যে ভ্যাট বেশি, সেখানে তেল কিনতে মানুষের বেশি টাকা খরচ হয়।

সাধারণ মানুষের বোঝার সুবিধার্থে: ভ্যাট (VAT) আসলে কী?
মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট হলো এমন একটি ইনডাইরেক্ট ট্যাক্স, যা কোনো পণ্য বা পরিষেবার হাতবদল এবং মূল্যবৃদ্ধির প্রতিটি পর্যায়ে ধাপে ধাপে আরোপ করা হয়। সহজ কথায়, তেল যখন শোধনাগার থেকে ডিলারের হাত হয়ে পাম্পে পৌঁছায়, তখন প্রতিটি স্তরে সরকার সেই বর্ধিত মূল্যের ওপর কর চাপায়। পরিশেষে, এই সম্পূর্ণ করের বোঝাটি এসে বর্তায় আমজনতা তথা সাধারণ ভোক্তার ওপরেই, যিনি পাম্পে গিয়ে চূড়ান্ত মূল্যটি পরিশোধ করেন।

কেন একে জিএসটি (GST)-র আওতার বাইরে রাখা হয়েছে?
বর্তমানে দেশজুড়ে ‘এক দেশ এক কর’ বা জিএসটি চালু থাকলেও পেট্রোল ও ডিজেলকে এর আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। তাই বর্তমানে কেন্দ্রীয় আবগারি শুল্ক, রাজ্যের ভ্যাট, রোড সেস এবং পেট্রোল পাম্পের ডিলার কমিশন—সব আলাদা আলাদাভাবে যোগ হয়ে তেলের চূড়ান্ত দাম নির্ধারিত হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পেট্রোল ও ডিজেলকে যদি জিএসটি-র সর্বোচ্চ ২৮ শতাংশের আওতায় আনা যেত, তবে দেশজুড়ে তেলের দাম এক ধাক্কায় লিটার প্রতি অনেকটাই কমে যেত। কিন্তু পেট্রোল ও ডিজেল বিক্রি থেকে রাজ্য সরকারগুলোর হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব (Revenue) আয় হয়, যা রাস্তা, বিদ্যুৎ, জল এবং অন্যান্য সরকারি উন্নয়নমূলক প্রকল্পে ব্যবহৃত হয়। জিএসটি চালু হলে রাজ্যগুলোর এই আয়ের উৎস হাতছাড়া হবে। এই কর রাজস্বের ক্ষতি সামাল দেওয়ার আশঙ্কাতেই রাজ্য সরকারগুলো ভ্যাট কমানোর বা একে জিএসটির আওতায় আনার ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক পদক্ষেপ নেয়।