একই তেল, অথচ শহর বদলালেই খসছে বাড়তি ১০ টাকা! দিল্লি সস্তা হলে কলকাতা কেন অগ্নিমূল্য? ফাঁস হলো আসল ‘অঙ্ক’

শুক্রবার সকাল থেকেই আমজনতার পকেটে বড়সড় ধাক্কা দিয়েছে কেন্দ্র সরকার। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার জেরে দেশজুড়ে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম লিটার প্রতি ৩ টাকা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু এই মূল্যবৃদ্ধির মাঝেও একটি প্রশ্ন সাধারণ মানুষকে বারবার ভাবিয়ে তুলছে— একই দেশে থেকেও কেন শহরভেদে তেলের দাম আলাদা? কেন দিল্লির তুলনায় কলকাতা বা মুম্বইয়ে পেট্রোল কিনতে ১০-১১ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে?
আসল খেলা যেখানে: VAT এবং করের প্যাঁচ
জ্বালানির দামের এই বিশাল পার্থক্যের প্রধান কারণ হলো রাজ্য সরকারের আরোপিত VAT (ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স)। ভারত কেন্দ্রীয়ভাবে অপরিশোধিত তেল আমদানি করলেও এবং রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি প্রতিদিন দাম সংশোধন করলেও, শেষ পর্যন্ত দামটি কত হবে তা ঠিক করে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের কর কাঠামো।
পেট্রোল ও ডিজেল এখনও জিএসটি-র (GST) আওতাভুক্ত নয়। ফলে প্রতিটি রাজ্য সরকার নিজেদের আয় বুঝে তেলের ওপর বিক্রয় কর বা ভ্যাট বসায়।
দিল্লি: এখানে ঐতিহাসিকভাবে ভ্যাটের হার কম রাখা হয়েছে, যার ফলে বড় মেট্রো শহরগুলোর মধ্যে দিল্লিতেই জ্বালানি সবথেকে সস্তা। আজ সেখানে পেট্রোল ৯৭.৭৭ টাকা।
কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গে জ্বালানির ওপর করের হার তুলনামূলক বেশি। ফলে শুক্রবারের বৃদ্ধির পর কলকাতায় পেট্রোলের দাম দাঁড়িয়েছে ১০৮.৭৪ টাকা।
মুম্বই ও চেন্নাই: মহারাষ্ট্র ও তামিলনাড়ুর আলাদা কর কাঠামোর কারণে মুম্বইয়ে দাম ১০৬.৬৮ টাকা এবং চেন্নাইয়ে ১০৩.৬৭ টাকা।
পরিবহণ খরচ কি দায়ী?
অনেকেই মনে করেন রিফাইনারি থেকে দূরত্বের কারণে দাম বাড়ে। পরিবহণ বা ফ্রেট চার্জের কিছুটা প্রভাব থাকলেও তা খুব সামান্য। আসল ফারাক গড়ে দেয় রাজ্যের সীমান্ত। অনেক সময় দেখা যায়, সমুদ্রতীরবর্তী হওয়া সত্ত্বেও মুম্বই বা কলকাতায় তেলের দাম দিল্লির চেয়ে অনেক বেশি, যা প্রমাণ করে যে স্থানীয় করই এখানে প্রধান নিয়ন্ত্রক।
কেন আন্তর্জাতিক বাজারে আগুন?
এই সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির মূলে রয়েছে পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি। ইজরায়েল-ইরান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালী নিয়ে তৈরি হওয়া আশঙ্কার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছে। ভারত তার চাহিদার ৮০ শতাংশেরও বেশি তেল আমদানি করে, তাই বিশ্ববাজারের সামান্য কম্পনও সরাসরি প্রভাব ফেলে আমাদের পেট্রোল পাম্পে।
এক দেশ, এক দাম কি সম্ভব?
বিশেষজ্ঞদের মতে, পেট্রোল-ডিজেলকে জিএসটি-র আওতায় আনলেই সারা দেশে অভিন্ন মূল্য চালু করা সম্ভব। তবে অধিকাংশ রাজ্য সরকার এতে নারাজ। কারণ জ্বালানি থেকে আসা রাজস্ব দিয়েই রাজ্যের জনকল্যাণমূলক প্রকল্প ও পরিকাঠামো উন্নয়নের বড় অংশ খরচ করা হয়।
কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরি যদিও আশ্বস্ত করেছেন যে, বিশ্ববাজারে অস্থিরতা থাকলেও দেশে জ্বালানির জোগানে কোনও ঘাটতি নেই। তবে আমজনতার প্রশ্ন একটাই—আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে কি তার সুফল একইভাবে সাধারণ মানুষের পকেটে পৌঁছাবে?