SSC: ২৬ হাজার নিয়োগ বাতিল, সুপ্রিম কোর্টে রিভিউ পিটিশনের পথে ‘যোগ্য’ চাকরিহারারা

স্কুল সার্ভিস কমিশনের (এসএসসি) ২০১৬ সালের নিয়োগ প্যানেল সম্পূর্ণ বাতিলের বিরুদ্ধে এ বার সুপ্রিম কোর্টে রিভিউ পিটিশন দাখিল করতে চলেছে ‘যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকা অধিকার মঞ্চ’। এই উদ্দেশ্যে আইন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করার জন্য তথাকথিত ‘যোগ্য’ চাকরিচ্যুতদের কয়েকজন ইতিমধ্যেই দিল্লিতে পৌঁছে গিয়েছেন। তবে শীর্ষ আদালতে ‘যোগ্য’ চাকরিহারাদের বিষয়ে রিভিউ পিটিশন কে দাখিল করবে— রাজ্য সরকার, মধ্যশিক্ষা পর্ষদ নাকি এসএসসি, তা নিয়ে শনিবার পর্যন্ত স্কুল শিক্ষা দপ্তর এবং এসএসসি কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে বিষয়টি নিয়ে জল্পনা অব্যাহত রয়েছে।

রাজ্যের সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত উচ্চ প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী নিয়োগের দায়িত্বে থাকে এসএসসি। ২০১৬ সালের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, পরীক্ষা গ্রহণ, ইন্টারভিউ প্রক্রিয়া, প্যানেল প্রকাশ এবং নিয়োগের সুপারিশ—এই সমস্ত কিছুই কমিশন কর্তৃক সম্পন্ন হয়েছিল। বিকাশ ভবন সূত্রে খবর, সেই কারণে শিক্ষা দপ্তর চাইছে, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খান্নার ডিভিশন বেঞ্চের রায়ে প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীর নিয়োগ বাতিলের যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেই মামলায় এসএসসি-ই রিভিউ পিটিশন দাখিল করুক। তবে সরকারি আধিকারিকদের মধ্যেই এই বিষয়ে ভিন্ন মত দেখা যাচ্ছে। শিক্ষা দপ্তরের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিকের মতে, কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি দেবাংশু বসাকের ডিভিশন বেঞ্চ গত বছরের ২২ এপ্রিল নিয়োগ প্যানেল সম্পূর্ণ বাতিল করার পর সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে রাজ্য সরকার, এসএসসি এবং মধ্যশিক্ষা পর্ষদ যৌথভাবে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছিল। তাই এখনও রিভিউ পিটিশন রাজ্য, পর্ষদ এবং কমিশন—এই তিন পক্ষের একসঙ্গে করা উচিত। এতে আবেদনের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।

যদিও শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু শুক্রবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছিলেন, “রিভিউ পিটিশন বা এই ধরনের টেকনিক্যাল বা আইনি বিষয়গুলি তো এসএসসির ব্যাপার। কমিশন তাদের আইনি প্রক্রিয়া মেনেই রিভিউ পিটিশন করতেই পারে। এই ব্যাপারে ওরা যদি স্কুলশিক্ষা দপ্তরের আইনি সাহায্য চায়, তবে সেই আইনি পরামর্শ নিশ্চয়ই দেওয়া হবে।” যোগ্য প্রার্থীদের একাংশের অভিযোগ, শিক্ষামন্ত্রীর এই বক্তব্যে স্পষ্ট যে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরেও রাজ্য সরকার এখনও যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকাদের পাশে নেই। যদিও শনিবার শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে এই বিষয়ে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

‘যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকা অধিকার মঞ্চ’-এর কনভেনর মেহবুব মণ্ডল এদিন বলেন, “সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের সঙ্গে ইতিমধ্যেই আমাদের প্রাথমিক আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে। প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চের রায়ই স্পষ্ট করে দিয়েছে যে ২৫,৭৫২ জন প্রার্থীর মধ্যে দুটি ভাগ রয়েছে। একটি দল অযোগ্য ও দুর্নীতিগ্রস্ত, যাদের সংখ্যা ৬,২৭৬ জন। তাঁদের শীর্ষ আদালত বেতন বাবদ নেওয়া টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে এবং তাঁরা ভবিষ্যতে এসএসসির পরীক্ষাতেও বসতে পারবেন না। বাকি আমরা (১৯,৪৭৬ জন) যোগ্য প্রার্থী।”

তিনি আরও বলেন, “আদালত আমাদের বেতন হিসেবে পাওয়া টাকা ফেরত দিতে বলেনি। এমনকি আমাদের নতুন নিয়োগে বয়সের ছাড় দেওয়ার কথাও বলেছে। যাঁরা অন্য চাকরি ছেড়ে এসে ২০১৬ সালের নিয়োগে শিক্ষক বা শিক্ষাকর্মীর চাকরি পেয়েছিলেন, তাঁদের তিন মাসের মধ্যে সেই চাকরিতে ফিরে যাওয়ার সুযোগও দিয়েছে। শুধু তাই নয়, সেই শূন্যপদ বর্তমানে না থাকলে, তাঁদের জন্য সুপার নিউমেরারি পদ্ধতিতে এককালীন নতুন পদ তৈরি করেও নিয়োগ দিতে রাজ্য বাধ্য থাকবে—এমনটাও আদালত জানিয়েছে।” এই যুক্তির উপর ভিত্তি করেই ‘যোগ্য’ চাকরিহারারা পুনরায় সুপ্রিম কোর্টে রিভিউ পিটিশন দাখিল করতে চান।

কর্মচ্যুত শিক্ষিকা তাপসী শাসমল বলেন, “সুপ্রিম কোর্টের রায়ই প্রমাণ করে যে ১৯,৪৭৬ জন প্রার্থীর যোগ্যতা নিয়ে সর্বোচ্চ আদালতের কোনও প্রশ্ন নেই। তা সত্ত্বেও এসএসসির নিয়োগ প্রক্রিয়ার উপর সংশয় প্রকাশ করে প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ আমাদের চাকরি বাতিল করেছে। সেটা না করে রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগে সার্চ কমিটি গঠনের মতোই সুপ্রিম কোর্টের কোনও অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে দিয়ে তদন্ত করালে আরও ভালো হতো। আমরা তেমনই আর্জি জানানোর কথা ভাবছি সুপ্রিম কোর্টে।”

এখন দেখার বিষয়, ‘যোগ্য’ চাকরিহারারা শেষ পর্যন্ত কবে রিভিউ পিটিশন দাখিল করতে পারেন এবং রাজ্য সরকার বা এসএসসি এই বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়। আইনি লড়াই কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছেন হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থী ও তাদের পরিবার।