‘পাশে দাঁড়াতে চাই’,-যৎসামান্য পারিশ্রমিকে প্রাইভেট টিউটর-রা রাজি ক্লাস করাতে, জমছে বায়ো-ডেটাও

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এক লপ্তে প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি যাওয়ায় রাজ্যের সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলগুলিতে চরম সঙ্কট তৈরি হয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক কর্মীর মধ্যে প্রায় ১৯ হাজার শিক্ষক এবং বাকিরা শিক্ষাকর্মী। এমনিতেই রাজ্যের স্কুলগুলিতে শিক্ষকের অভাব প্রকট, তার উপর এই অপ্রত্যাশিত বিপর্যয় পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে।

প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক-শিক্ষিকাদের আশঙ্কা, এর ফলে পড়ুয়ারা আরও বেশি করে প্রাইভেট টিউটরদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। নিয়মিত স্কুলে এসে ক্লাস করার আগ্রহও তাদের মধ্যে কমতে পারে। প্রাইভেট টিউশনের রমরমা থাকায় এমনিতেই অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত স্কুলে আসে না, কেবল পরীক্ষার সময়ই তাদের দেখা মেলে। এতদিন পর্যন্ত যে অল্প সংখ্যক ছাত্রছাত্রীকেও প্রাইভেট টিউশনের হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখা গিয়েছিল, এবার তারাও সেই পথ বেছে নেবে বলে মনে করছেন অনেকে।

এই পরিস্থিতিতে শহর, শহরতলি এবং জেলার বিভিন্ন স্কুলে প্রাইভেট টিউটরদের আনাগোনা ক্রমশ বাড়ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। গত দু’দিনে বহু স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এমন অনেক প্রাইভেট টিউটর যোগাযোগ করেছেন, যারা এই সঙ্কটকালে স্কুলগুলির পাশে দাঁড়াতে আগ্রহী। প্রয়োজনে বিনা পারিশ্রমিকে অথবা যৎসামান্য পারিশ্রমিকে স্কুলে গিয়ে ক্লাস নিতেও তারা রাজি। এই পরিস্থিতিতে প্রধান শিক্ষকরা মনে করছেন, বিপদের সময় এই টিউটরদের সাহায্য অবশ্যই কাজে লাগতে পারে। তবে স্কুল যাতে প্রাইভেট টিউশনের বিজ্ঞাপন বা ছাত্র ধরার কেন্দ্রে পরিণত না হয়, সেদিকে নজর রাখা জরুরি।

দমদম, কলকাতা, হলদিয়া, কোচবিহার, মেদিনীপুর, পূর্ব বর্ধমান সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে একই ধরনের খবর পাওয়া যাচ্ছে। জানা যাচ্ছে, বহু উৎসাহী যুবক স্বতঃপ্রণোদিতভাবে স্কুলগুলির সঙ্গে যোগাযোগ করছেন এবং বিনা পারিশ্রমিকে বা স্বল্প পারিশ্রমিকে ক্লাস নেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছেন। এদের মধ্যে অনেকেই উচ্চশিক্ষিত, এমনকি এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রিধারীও রয়েছেন। প্রধান শিক্ষকরা তাদের পেশা সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা জানাচ্ছেন যে তারা মূলত প্রাইভেট টিউটর। তবে শিক্ষার স্বার্থে এবং ছাত্রছাত্রীদের কথা ভেবেই তারা স্কুলগুলির পাশে দাঁড়াতে চান।

যেমন, দমদমের শ্রী অরবিন্দ বিদ্যামন্দিরে তিনজন শিক্ষক তাদের চাকরি হারিয়েছেন। প্রধান শিক্ষক অসীম নন্দ জানান, “ইতিমধ্যেই অনেকে স্কুলের পাশে দাঁড়াতে চাইছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই পেশায় প্রাইভেট টিউটর। তিনটি বায়ো-ডেটাও জমা পড়েছে।” তবে এই বিষয়ে ম্যানেজিং কমিটির সঙ্গে আলোচনা করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে তিনি জানান। পূর্ব বর্ধমানের গুসকরাতেও একটি স্কুলে এমন বেশ কয়েকজন প্রাইভেট টিউটর যোগাযোগ করেছেন। হলদিয়ার গভ স্পনসর্ড বিবেকানন্দ বিদ্যা ভবনের প্রধান শিক্ষক হরিদাস ঘটক জানান, তাদের স্কুলে পাঁচজন শিক্ষকের পদ শূন্য হয়েছে। কম্পিউটার সায়েন্স, বায়োলজি, হিস্ট্রির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনও শিক্ষক নেই। অথচ স্কুলে প্রায় আড়াই হাজার ছাত্রছাত্রী। হরিদাস বলেন, “এই কঠিন পরিস্থিতিতে স্কুলের পাশে দাঁড়াতে চেয়ে এলাকার বেশ কয়েকজন যুবক যোগাযোগ করেছেন। তারা সামান্য ভাতাতেই কাজ করতে রাজি। এতে আমাদের উপকার হবে ঠিকই, তবে স্কুলটা যাতে প্রাইভেট টিউশনের ছাত্র ধরার আখড়া না হয়ে ওঠে, সে বিষয়ে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।”

এমনিতেই পশ্চিমবঙ্গে প্রাইভেট টিউশনের হার দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০০৯ সালে এসসিইআরটি-র রিপোর্ট অনুযায়ী, রাজ্যের মোট শিক্ষার্থীর ৮০ শতাংশেরও বেশি প্রাইভেট টিউশনের উপর নির্ভরশীল। শহরের তুলনায় গ্রামে এই প্রবণতা আরও বেশি। এরপর ২০২২ সালের কেন্দ্রীয় রিপোর্ট (অসর)-এ জানা যায়, এ রাজ্যে প্রাইভেট টিউশনের চাহিদা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রাইভেট টিউটরদের সর্বভারতীয় সংগঠনের সভাপতি উজ্জ্বল দত্ত বলেন, “কিছু টিউটর এই সুযোগে ছাত্র ধরার জন্য ঘোরাঘুরি করবেই। স্কুলগুলিকে এ বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। এই সঙ্কটে স্কুলগুলি যদি আমাদের সাহায্য চায়, আমরা রাজি আছি। তবে স্কুলে স্থায়ীভাবে পড়ানোর কোনও বাসনা আমাদের নেই।” যাদবপুর বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক পার্থপ্রতিম বৈদ্যের কথায়, “এই সমস্যায় আরও বেশি ছাত্রছাত্রী যাতে স্কুলবিমুখ না হয়ে পড়ে, সে বিষয়ে আমাদেরই খেয়াল রাখতে হবে।”

চাকরিহারাদের হাত ধরতে এগিয়ে এসেছেন স্থানীয় নেতারাও

অন্যদিকে, বিভিন্ন স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের সঙ্গে স্থানীয় অনেক রাজনৈতিক নেতাও যোগাযোগ করছেন বলে খবর। তারাও এই কঠিন সময়ে স্কুলের পাশে দাঁড়াতে চেয়ে পার্ট-টাইম শিক্ষক হিসেবে বেশ কিছু নাম সুপারিশ করছেন। পশ্চিমবঙ্গ প্রধান শিক্ষক সমিতির সম্পাদক কৃষ্ণাংশু মিশ্র বলেন, “এই সঙ্কট না কাটলে পার্ট-টাইমার নিয়োগ করা ছাড়া উপায় নেই। আর সেটা ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমেই হবে। ফলে স্বজনপোষণের আশঙ্কা যেমন বাড়ছে, তেমনই স্কুলগুলিকে প্রাইভেট টিউশনের স্বার্থে ব্যবহারের পথও প্রশস্ত হতে পারে।”

এই সমস্যা সমাধানের জন্য এখন অনেকেই মধ্যশিক্ষা পর্ষদের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। তবে সুপ্রিম কোর্টের রায় ঘোষণার দু’দিন পরেও পর্ষদ নীরব থাকায় উদ্বেগ বাড়ছে। প্রধান শিক্ষকদের অন্য একটি সংগঠনের তরফে চন্দন মাইতিরা এদিনই পর্ষদের কাছে চিঠি দিয়ে দ্রুত সমাধানের আবেদন জানিয়েছেন। চন্দনের কথায়, “সরকার ছুটি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই মধ্যশিক্ষা পর্ষদ ম্যাচিং অর্ডার বের করে। আর এত বড় ঘটনার দু’দিন পরেও তারা মুখে কুলুপ এঁটে রেখেছে। কেন? কী ভাবে চলবে স্কুলগুলি?” পর্ষদের নীরবতা স্কুলের শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকদের মধ্যে আরও বেশি অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।