বিশেষ: কার্শিয়াঙে যে বাড়িতে গৃহবন্দি ছিলেন সুভাষ, রয়েছে নেতাজির লাগানো সেই গাছও!

কার্শিয়াং শহর থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে মনোরম গিদ্দা পাহাড়ে অবস্থিত একটি বিশেষ বাড়ি আজ ইতিহাসপ্রেমী ও পর্যটকদের কাছে এক গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। এই বাড়িটি নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর স্মৃতিবিজড়িত, যেখানে তিনি একসময় গৃহবন্দী অবস্থায় বেশ কিছু সময় কাটিয়েছিলেন। বর্তমানে এই বাড়িটি একটি মিউজিয়াম হিসেবে পরিচিত, যা নেতাজীর জীবনের নানা দিক এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসকে তুলে ধরে।
মিউজিয়ামের আকর্ষণ:
এই মিউজিয়ামে নেতাজীর বহু মূল্যবান স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষিত আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল তাঁর ঐতিহাসিক চিঠি, বিভিন্ন সময়ের ছবি এবং তাঁর ব্যবহৃত জিনিসপত্র, যেমন – রুনা খাট, ড্রেসিং টেবিল, লেখাপড়ার টেবিল ও চেয়ার। ১৯৩৪ সালে নেতাজীর দাদা শরৎচন্দ্র বসু কর্তৃক রোপিত একটি ক্যামেলিয়া গাছ আজও সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। পাগলাঝোড়ার পাহাড়ি ঝর্ণার ধারে নেতাজীর প্রাতঃভ্রমণের (মর্নিংওয়াক) ছবিও এখানে দেখা যায়। এছাড়াও, বসু পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নেতাজীর অনেক দুর্লভ ছবিও এখানে সংরক্ষিত আছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
নেতাজী ইনস্টিটিউট ফর এশিয়ান স্টাডিজের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই মিউজিয়ামটির দায়িত্বে আছেন গণেশ প্রধান এবং কেয়ারটেকার হিসেবে আছেন পদমবাহাদুর হেরি। তাদের কাছ থেকে জানা যায়, ১৯২২ সালে শরৎচন্দ্র বসু তৎকালীন অসম পুলিশের ডেপুটি সুপার পিটার লেসলির কাছ থেকে এই বাড়িটি কিনেছিলেন। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত এটি বসু পরিবারের অধীনে ছিল। ১৯৯৭ সালে রাজ্য সরকার বাড়িটির সংস্কার করে এবং ২০০০ সালে এটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে মিউজিয়াম হিসেবে উদ্বোধন করা হয়।
নেতাজীর গৃহবন্দী জীবন:
১৯৩৬ সালের জুন থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত প্রায় ৬ মাস নেতাজী এই বাড়িতে ব্রিটিশদের দ্বারা গৃহবন্দী ছিলেন। শোনা যায়, হরিপুরা কংগ্রেসের ঐতিহাসিক ভাষণ তিনি এখানেই বসে লিখেছিলেন। এই বাড়ি থেকেই তিনি মহাত্মা গান্ধী ও জওহরলাল নেহেরুকে চিঠি লিখেছিলেন। ১৯২২ থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত বসু পরিবারের সদস্যরা যখন গরমের ছুটি বা পুজোর ছুটিতে এখানে আসতেন, নেতাজীও বেশ কয়েকবার তাদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন। ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত শরৎ বসুও এখানে অন্তরীণ ছিলেন।
গৃহবন্দী অবস্থায় নেতাজী চৌকিদারের মাধ্যমে গোপনে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ পাঠাতেন। এর পাশাপাশি, তিনি ভাইপো-ভাইঝিদের সঙ্গে খেলাধুলা করতেন, তাদের দোলনায় চড়াতেন। ১৯৭৩ সালে শিশির বসু ও কৃষ্ণা বসুর কাছ থেকে পন্যবাহাদুর ছেত্রি এই বাড়ির দেখাশোনার দায়িত্ব পান।
জার্মানির এমিলিকে নেতাজী এখান থেকে ২২টি চিঠি লিখেছিলেন, যেখানে তিনি এই স্থানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা উল্লেখ করেছিলেন।
বর্তমান চিত্র:
১৯৯৬ সালে রাজ্য সরকার এই বাড়িটির সংস্কার করে। প্রতি বছর এখানে নেতাজীর জন্মদিন বিশেষভাবে উদযাপন করা হয়। কার্শিয়াং-এর মহকুমা শাসক (এসডিও) জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন এবং স্থানীয় মানুষজনও এই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে নেতাজীর প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এই মিউজিয়ামটি নেতাজীর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের এক জীবন্ত প্রতীক।