টাচস্ক্রিনের বাড়াবাড়িতেই কি বাড়ছে বিপদ? বোতামের যুগ শেষ হতেই গাড়ি থেকে রান্নাঘর—সবাই কেন বিপাকে?

স্মার্টফোনের স্পর্শে অভ্যস্ত আমাদের আঙুলগুলো এখন আর কেবল ফোনে সীমাবদ্ধ নেই। গাড়ি থেকে শুরু করে ঘরের ওভেন, ওয়াশিং মেশিন—যেখানেই তাকানো যাক, স্ক্রিন আসার পর থেকেই একটা করে ফিজিক্যাল বাটন বা বোতাম যেন ধীরে ধীরে ড্যাশবোর্ড বা প্যানেল থেকে গায়েব হয়ে যাচ্ছে। দেখতে আধুনিক এবং আকর্ষণীয় লাগলেও, এই প্রযুক্তির বাড়াবাড়ি কি সত্যিই আমাদের জীবনকে সহজ করছে, নাকি অজান্তেই ডেকে আনছে বড় কোনো বিপদ?
টাচস্ক্রিনের সুবিধা বনাম মুশকিল স্মার্টফোনের দুনিয়ায় টাচস্ক্রিনের অবদান অনস্বীকার্য। হোয়াটসঅ্যাপ, ম্যাপ, ক্যামেরা কিংবা ইউটিউব—প্রতিটি কাজের জন্য আলাদা আলাদা ফিজিক্যাল বোতাম থাকলে ফোনের আকার বিশালাকার হতো। টাচস্ক্রিন সেই সমস্যার দুর্দান্ত সমাধান দিয়েছে। একই স্ক্রিন কখনও কিবোর্ড, কখনও আবার ক্যামেরা কন্ট্রোল বা মিউজিক প্লেয়ার হয়ে উঠতে পারে।
কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন প্রতিটি কাজের জন্য স্ক্রিনের উপর শতভাগ নির্ভর করতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, ক্যামেরার কথা ধরা যাক। ফিজিক্যাল ডায়াল বা বোতাম থাকলে আঙুল নিজে থেকেই বুঝে যায় কোন কন্ট্রোল কোথায় রয়েছে, ফলে বারবার চোখের দৃষ্টি সরানোর প্রয়োজন হয় না। কিন্তু একই জিনিস স্ক্রিনের ভেতর খুঁজতে গেলে চালক বা ব্যবহারকারীকে বিভ্রান্ত হতে হয়।
গাড়িতে ড্রাইভারের মনোযোগ বিচ্যুতি ও সাম্প্রতিক গবেষণা ২০২৬ সালের একটি ড্রাইভিং-সিমুলেটর গবেষণায় আলো, ওয়াইপার, ইন্ডিকেটর এবং ক্লাইমেট সেটিংসের ক্ষেত্রে টাচস্ক্রিন ও ফিজিক্যাল কন্ট্রোলের একটি তুলনা করা হয়। গবেষণায় পরিষ্কার ফুটে উঠেছে যে, টাচস্ক্রিন ব্যবহারে চালকদের চোখের দৃষ্টিগত বিচ্যুতি বা ডিস্ট্র্যাকশন অনেক বেশি হয়। কোনো একটি কাজ সম্পন্ন করতে একাধিকবার স্ক্রিনে হাত দিতে হলে গাড়ি চালানোর পারফরম্যান্সও খারাপ হয়। শুধু তাই নয়, সফটওয়্যার আপডেটের পর ইন্টারফেসের ডিজাইন বদলালে ব্যবহারকারীকে মানিয়ে নিতে আরও বেশি সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়।
বিষয়টি এতটাই গুরুতর আকার ধারণ করেছে যে, ইউরোপের গাড়ি নিরাপত্তা পরীক্ষা সংক্রান্ত সংস্থা Euro NCAP ২০২৬ সালের মূল্যায়ন পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। সংস্থার মতে, ইন্ডিকেটর, হ্যাজার্ড লাইট, হেডলাইট, ওয়াইপার এবং হর্নের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কন্ট্রোলগুলো স্পর্শ করার জন্য নির্দিষ্ট ফিজিক্যাল বা সহজে ব্যবহারযোগ্য অপশন থাকা দরকার, যাতে গাড়ি চালানোর সময় চালককে বাড়তি সমস্যায় পড়তে না হয়।
শুধু গাড়ি নয়, ঘরের অন্দরেও একই ছবি ঘরের নানা যন্ত্রপাতিতে এখন সাবেকী নব ও সুইচের জায়গায় চকচকে ফ্ল্যাট টাচ প্যানেল জায়গা করে নিয়েছে। দেখতে প্রিমিয়াম লাগলেও, রান্না করার সময় হাত ভেজা থাকলে বা প্রথমবার স্পর্শে কাজ না করলে একই জায়গায় বারবার ট্যাপ করতে গিয়ে বিরক্তি বাড়ে।
এর মানে এই নয় যে টাচস্ক্রিন সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়। নেভিগেশন ম্যাপ দেখা, গান চালানো কিংবা গাড়ির বিস্তারিত সেটিংস বদলানোর ক্ষেত্রে বড় ডিসপ্লের জুড়ি মেলা ভার। তবে সাধারণ দৈনন্দিন কাজের জন্য যদি সব কিছুতেই স্ক্রিনের উপর নির্ভর করতে হয়, তবে তা উপকারের চেয়ে সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। পুরনো দিনের যান্ত্রিক ড্যাশবোর্ডে ফিরে যাওয়ার প্রশ্ন নেই, তবে প্রযুক্তি এবং সুরক্ষার সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।