মাউসের ক্লিকেই লুকিয়ে চাকরি যাওয়ার ফাঁদ? মেটা অফিসে ধুন্ধুমার কান্ড

সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্ট মেটার (ফেসবুক) অন্দরে এবার বেনজির গৃহযুদ্ধ! কর্মীদের কম্পিউটারে মাউসের গতিবিধি ট্র্যাক করার একটি গোপন সফটওয়্যার চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে মেটা কর্তৃপক্ষ। আর এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই এবার কার্যত রণক্ষেত্রের রূপ নিয়েছে মার্ক জাকারবার্গের সংস্থা। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন মেটা অফিসে কোম্পানির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ শুরু করেছেন কর্মীরা। চলছে অনলাইন পিটিশনে সই সংগ্রহের কাজ। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, আসন্ন বড়সড় কর্মী ছাঁটাইয়ের খবরের মাঝেই এই প্রতিবাদের ঝড় মেটার ভেতরে এক নতুন রাজনৈতিক ও শ্রমিক আন্দোলনের জন্ম দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের হাতে আসা কিছু এক্সক্লুসিভ ছবিতে দেখা গেছে, প্রতিবাদী কর্মীরা মেটা অফিসের মিটিং রুম, ভেন্ডিং মেশিন, এমনকি টয়লেট পেপার ডিসপেনসারের ওপরও এই নজরদারির বিরুদ্ধে লিফলেট সেঁটে দিয়েছেন।
সেই লিফলেটে কর্মীদের অনলাইনে একটি পিটিশনে সই করার জোরালো আহ্বান জানিয়ে লেখা হয়েছে, “আপনারা কি একটি ‘এমপ্লয়ি ডেটা এক্সট্র্যাকশন ফ্যাক্টরি’ বা কর্মচারী তথ্য চুরির কারখানায় কাজ করতে চান?” কর্মীদের অভিযোগ, মেটা সম্প্রতি তাদের কম্পিউটারে এমন একটি প্রযুক্তি যুক্ত করেছে, যা তাদের মাউসের নড়াচড়া, প্রতিটি ক্লিক এবং স্ক্রিনের বিভিন্ন মেনু ব্যবহারের নিখুঁত তথ্য ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ ও সংগ্রহ করছে।
নিজের পায়ে কুড়ুল মারছেন মেটা কর্মীরা?
বিক্ষুব্ধ কর্মীদের আশঙ্কা অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। তাদের দাবি, দিনরাত এক করে কম্পিউটারে তারা যেভাবে কাজ করছেন, সেই মাউস ক্লিকের প্যাটার্ন বা তথ্য আসলে ব্যবহার করা হচ্ছে একটি উন্নত এআই (AI) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা তৈরি করতে। অর্থাৎ, কর্মীদের কাজের ধরন দেখিয়ে এআই-কে এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে মেটার এই কর্মীদেরই পুরোপুরি প্রতিস্থাপন বা চাকরি কেড়ে নিতে পারে। নিজের কাজ দিয়ে নিজেরই চাকরি খাওয়ার এই অদ্ভুত ফাঁদ কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তারা।
এই বিদ্রোহ এমন এক সময়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, যা মেটার জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। রিপোর্ট অনুযায়ী, ঠিক আগামী সপ্তাহেই মেটা তাদের মোট কর্মীবাহিনীর প্রায় ১০ শতাংশ ছাঁটাই করতে চলেছে। গত কয়েক মাস ধরেই এআই-ভিত্তিক পুনর্গঠন পরিকল্পনা এবং লাগাতার চাকরি কাটছাঁট নিয়ে কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের বারুদ জমছিল, যা এই মাউস ট্র্যাকিং সফটওয়্যারের হাত ধরে এক লহমায় বিস্ফোরিত হয়েছে।
মেটার অদ্ভুত সাফাই ও জাকারবার্গের ডিফেন্স
অবশ্য এই তীব্র প্রতিবাদের মুখেও নিজেদের নজরদারি প্রযুক্তির পাশেই দাঁড়িয়েছে মেটা। প্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রধান মুখপাত্র অ্যান্ডি স্টোন এক বিবৃতিতে এই সফটওয়্যারের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেছেন, “মানুষ কীভাবে কম্পিউটার ব্যবহার করে, তা বোঝার জন্য আমাদের বাস্তব তথ্যের প্রয়োজন। মাউসের নড়াচড়া, বাটনে ক্লিক বা বিভিন্ন মেনু ব্যবহারের ধরন আমাদের এআই মডেলকে আরও নিখুঁত ও কার্যকর করতে সহায়তা করবে।”
মেটার দাবি, তারা আসলে এমন একটি ‘এআই এজেন্ট’ তৈরি করছে যা ভবিষ্যতে সাধারণ ব্যবহারকারীদের দৈনন্দিন কম্পিউটারভিত্তিক কাজ নিজে থেকেই সম্পন্ন করতে পারবে। আর সেই কারণেই মানুষের বাস্তব ব্যবহারের আচরণ বিশ্লেষণ করা জরুরি।
আন্ডারগ্রাউন্ড শ্রমিক আন্দোলনের পথে ফেসবুক কর্মীরা!
প্রযুক্তি বিষয়ক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর মতে, এটি মেটার ইতিহাসে গড়ে ওঠা সবচেয়ে বড় এবং সংগঠিত অভ্যন্তরীণ শ্রমিক আন্দোলন। কর্মীদের লিফলেট ও পিটিশনে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম আইনের উল্লেখ করে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, কর্মপরিবেশের নিরাপত্তার স্বার্থে একজোট হওয়া কর্মীদের আইনগত অধিকার।
আগুন শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ নেই; আটলান্টিকের ওপারে যুক্তরাজ্যেও মেটার কর্মীরা এখন নিজেদের অধিকার রক্ষায় ইউনিয়ন গঠনের পথে হাঁটছেন। সেখানে তারা ‘ইউনাইটেড টেক অ্যান্ড অ্যালাইড ওয়ার্কার্স’ নামের একটি সংগঠনের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন এবং নতুন সদস্য সংগ্রহের জন্য আলাদা ওয়েবসাইটও চালু করে ফেলেছেন।
সংগঠনটির প্রতিনিধি এলিনর পেইন মেটা কর্তৃপক্ষের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “মেটার সাধারণ কর্মীরা এখন ম্যানেজমেন্টের অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং ব্যয়বহুল এআই কৌশলের নির্মম বলি হচ্ছেন। একদিকে কর্মীদের মাথায় চাকরি হারানোর তরোয়াল ঝুলছে, অন্যদিকে তাদের এমন এক প্রযুক্তিকে প্রশিক্ষণ দিতে বাধ্য করা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে তাদেরই অস্তিত্ব মুছে দেবে। এটা মেনে নেওয়া যায় না।” সিলিকন ভ্যালির এই নজিরবিহীন ক্ষমতার লড়াই আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার।