AI-কি ধ্বংস করবে সমাজ? গোপন তথ্য ফাঁাস করে তোলপাড় ফেললেন বিশেষজ্ঞ!

গুগল সার্চ বা উইকিপিডিয়ার দিন কি ফুরিয়ে আসছে? বর্তমান যুগে যেকোনো জটিল প্রশ্নের উত্তর জানতে বা তথ্য পেতে আমরা চোখ বুজে ভরসা করছি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর। কিন্তু এই প্রযুক্তি আমাদের যে তথ্য দিচ্ছে, তা কতটা নির্ভুল আর কতটা নিরপেক্ষ? নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে কোনো সুক্ষ্ম এজেন্ডা? এই প্রশ্ন তুলে বিশ্বজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন মেটার (ফেসবুক) সাবেক নিউজ প্রধান ক্যাম্পবেল ব্রাউন। তার স্পষ্ট দাবি, বর্তমান এআই শিল্প এখনো সত্য ও নির্ভুল তথ্য পরিবেশনকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না।
এক সময়ের নামী টেলিভিশন সাংবাদিক ক্যাম্পবেল ব্রাউন পরবর্তীতে ফেসবুকের প্রথম নিউজ প্রধান হিসেবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব সামলেছেন। প্রযুক্তি ও তথ্যের মেলবন্ধনকে তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। বর্তমানে তিনি এআই মডেলগুলোর তথ্য যাচাইয়ের জন্য ‘ফোরাম এআই’ নামক একটি বিশেষ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন।
সম্প্রতি সান ফ্রান্সিসকোতে টেকক্রাঞ্চের একটি হাই-প্রোফাইল অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে ব্রাউন সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের তথ্য গ্রহণের ধরণকে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় বদলে দিচ্ছে। কিন্তু আসল উদ্বেগের জায়গা হলো—এই এআই ঠিক কী বলবে, কোন তথ্যকে বেশি হাইলাইট করবে আর কোন সত্যকে ধামাচাপা দেবে, তা আসলে ঠিক করছে কে?
‘হাই-স্টেক’ বা সংবেদনশীল ক্ষেত্রে ব্যর্থ এআই?
ক্যাম্পবেল ব্রাউনের প্রতিষ্ঠান ‘ফোরাম এআই’ মূলত বিশ্বসেরা এআই মডেলগুলোকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে মূল্যায়ন করে। বিশেষ করে ভূরাজনীতি, মানসিক স্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং চাকরি নিয়োগের মতো অতি সংবেদনশীল বিষয়গুলোতে, যেখানে কোনো ‘সাদা-কালো’ বা সহজ উত্তর হয় না। এই জটিল ক্ষেত্রগুলোতে এআই কতটা সঠিক কথা বলছে, তা পরীক্ষা করতে ব্রাউন বিশ্বমঞ্চের একঝাঁক মহীরুহকে নিজের সাথে যুক্ত করেছেন। এই তালিকায় আছেন বিখ্যাত আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক নিয়াল ফার্গুসন, প্রখ্যাত সাংবাদিক ফরিদ জাকারিয়া, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী টনি ব্লিঙ্কেন এবং সাবেক হাউস স্পিকার কেভিন ম্যাকার্থির মতো ব্যক্তিত্বরা।
ব্রাউন জানান, চ্যাটজিপিটি যখন প্রথম বাজারে আসে, তখনই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে এটিই হতে চলেছে ভবিষ্যতের তথ্য প্রবাহের মূল চাবিকাঠি। কিন্তু তখনকার এআই-এর উত্তর দেখে তিনি চরম হতাশ হন। তিনি বলেন, “এই প্রযুক্তি যদি শুরুতেই ঠিকভাবে কাজ না করে, তবে আগামী প্রজন্ম সম্পূর্ণ ভুল ও পক্ষপাতদুষ্ট তথ্যের বেড়াজালে বড় হবে।” তার অভিযোগ, বড় বড় এআই কোম্পানিগুলো শুধু কোডিং আর গণিতের দক্ষতা বাড়াতে ব্যস্ত, কিন্তু সংবাদ বা বাস্তব তথ্য যাচাইয়ের মতো কঠিন বিষয়গুলোকে তারা চরম অবহেলা করছে।
গুগলের জেমিনি ও রাজনৈতিক পক্ষপাত: বিস্ফোরক অডিট রিপোর্ট
ফোরাম এআই-এর সাম্প্রতিক মূল্যায়নে উঠে এসেছে কিছু চমকে দেওয়ার মতো তথ্য। ব্রাউন দাবি করেন, গুগলের ‘জেমিনি’ অনেক ক্ষেত্রে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে তথ্য দেওয়ার জন্য খোদ চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ওয়েবসাইটকে সূত্র (Source) হিসেবে ব্যবহার করেছে! শুধু গুগল নয়, বর্তমানের প্রায় প্রতিটি বড় এআই মডেলেই স্পষ্ট রাজনৈতিক পক্ষপাত এবং একপাক্ষিক যুক্তি উপস্থাপনের প্রবণতা দেখা গেছে। অনেক সময় এআই কোনো ঘটনার মূল প্রেক্ষাপট বা তার বিপরীত যুক্তিগুলোকে পুরোপুরি গায়েব করে দেয়।
ফেসবুকের ভুল থেকে কি শিক্ষা নেবে সিলিকন ভ্যালি?
ফেসবুকে কাজ করার নিজস্ব অভিজ্ঞতা টেনে ব্রাউন একটি বড় সত্য সামনে এনেছেন। তিনি দেখেছেন, কোনো প্ল্যাটফর্ম যদি কেবল ব্যবহারকারীর মনোযোগ ধরে রেখে ব্যবসার পরিধি বাড়ানো বা ‘এনগেজমেন্ট’-এর পেছনে ছোটে, তবে তা সমাজের জন্য বিষাক্ত হয়ে দাঁড়ায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই লাইক-শেয়ারের প্রতিযোগিতাই আজ সমাজকে চরম বিভ্রান্ত করেছে।
এখন বড় প্রশ্ন হলো, চ্যাটজিপিটি বা জেমিনির মতো এআই কি ফেসবুকের সেই মারাত্মক ভুলের পুনরাবৃত্তি করবে? তারা কি কেবল ব্যবহারকারীর মন যুগিয়ে বা তাদের পছন্দমতো ভুল উত্তর দিয়ে নিজেদের জনপ্রিয়তা বাড়াবে, নাকি কঠিন বাস্তব ও সত্য তথ্য তুলে ধরবে?
ব্রাউন মনে করেন, সাধারণ কোনো পরীক্ষা বা ডেমো দিয়ে এআই-এর আসল ঝুঁকি ধরা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন বাস্তব পরিস্থিতি ও জটিল উদাহরণ দিয়ে বিশেষজ্ঞ স্তরের অডিট। আর এই পরিবর্তনের চাকা ঘোরাতে পারে বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো। কারণ ব্যাংক, বীমা বা নিয়োগের মতো ক্ষেত্রে এআই ভুল তথ্য দিলে আর্থিক ও আইনি বিপর্যয় নেমে আসবে। ফলে ব্যবসার স্বার্থেই তারা একটি নির্ভুল ও সৎ এআই ব্যবস্থার দাবি তুলবে, যা হয়তো এই প্রযুক্তিকে সঠিক পথে ফেরাতে বাধ্য করবে।