বিশেষ: ব্যবসা, উদ্ভাবনে বাঁহাতি সিইওরা কি আসলেই ভালো? জেনেনিন কি বলছে গবেষকরা?

স্টিভ জবস, বিল গেটস, মার্ক জাকারবার্গের মতো আজকের প্রযুক্তি বিশ্বে অত্যন্ত প্রভাবশালী বহু ব্যক্তি বাঁহাতি। বিশ্ব জনসংখ্যার মাত্র ১০ শতাংশ বাঁহাতি হলেও, বিস্ময়করভাবে সফল প্রযুক্তি উদ্ভাবক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে এই সংখ্যাটা তুলনামূলকভাবে বেশি। দীর্ঘকাল ধরে বাঁহাতিদের মস্তিষ্কের ডান অংশের সঙ্গে যুক্ত সৃজনশীলতার কারণে বেশি উদ্ভাবনী বলে মনে করা হলেও, ব্যবসা বা কর্পোরেট উদ্ভাবনের সঙ্গে এর সরাসরি যোগসূত্র নিয়ে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সীমিত ছিল। তবে নতুন এক গবেষণা এই বিষয়ে আলোকপাত করেছে।

হংকংয়ের ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি-র অধ্যাপক লং চেন, জুন উ পার্ক ও তাদের সহকর্মীরা একটি নতুন গবেষণা করেছেন এই প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে যে, বাঁহাতি প্রযুক্তি সিইওরা কি সত্যিই কোম্পানি পরিচালনায় আরও উদ্ভাবনী ভূমিকা রাখেন কিনা।

গবেষকরা ‘এস অ্যান্ড পি ৫০০’-এর অন্তর্ভুক্ত এক হাজারেও বেশি কোম্পানির সিইও’র মধ্যে কতজন ডানহাতি আর কতজন বাঁহাতি তা খুঁজে বের করার জন্য বিভিন্ন দৃশ্যমান সূত্র যেমন – ছবি, ভিডিও, তারা কোন হাতে ঘড়ি পরেন বা কীভাবে গলফ ক্লাব ধরেন – ইত্যাদি ব্যবহার করেছেন। কে বাঁহাতি বা ডানহাতি তা শনাক্ত করার পর গবেষণা দলটি ১৯৯২ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে সেসব কোম্পানির উদ্ভাবনী কর্মসক্ষমতা পরীক্ষা করে দেখেছে। এজন্য তারা কোম্পানিগুলো কতগুলো পেটেন্ট বা নতুন আবিষ্কারের স্বত্ব পেয়েছে এবং সেসব পেটেন্ট অন্য গবেষক বা প্রতিষ্ঠান দ্বারা কতবার উদ্ধৃত বা ব্যবহৃত হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করেছেন। সিইওদের বয়স, শিক্ষা এবং তিনি কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা কিনা – এই বিষয়গুলোও তারা খতিয়ে দেখেছেন যাতে ফলাফলের অন্য কোনো কারণ না থাকে।

গবেষণায় উঠে এসেছে, বাঁহাতি সিইওদের নেতৃত্বে থাকা কোম্পানিগুলো কেবল প্রচলিত প্রযুক্তির বৈচিত্র্যই নয়, বরং বেশি সংখ্যক উদ্ভাবনী ও মৌলিক পেটেন্টও তৈরি করেছে। এই সিইও’রা দক্ষ কর্মী নিয়োগের দিকেও বেশি মনোযোগী ছিলেন, বিশেষ করে স্টেম (STEM – বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল, গণিত) খাতে এবং বিদেশি উদ্ভাবকদেরও নিয়োগ দিতেন। মূলত তারা মেধা ও উদ্ভাবনকে উচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। গবেষণায় দেখা গেছে অনেক বাঁহাতি সিইও নিজেই ব্যক্তিগতভাবেও একজন উদ্ভাবক ছিলেন।

উদ্ভাবন নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক দিক, তবে বড় প্রশ্ন হচ্ছে এটি কি সত্যিই ব্যবসার আর্থিক উন্নতিতে সাহায্য করে? গবেষণার ফলাফল বলছে, করে। ডানহাতি সিইওদের তুলনায় যেসব কোম্পানির নেতৃত্বে বাঁহাতি সিইওরা রয়েছেন, সেগুলোর সম্পদের ওপর লাভের হার (Return on Assets) বেশি এবং দীর্ঘমেয়াদে তাদের শেয়ার বাজারের কর্মক্ষমতাও ভালো। এই উদ্ভাবনী ক্ষমতা আসলে কোম্পানির আর্থিক ফলেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

অবশ্য এর মানে এই নয় যে ডানহাতি সিইওরা উদ্ভাবনী হতে পারেন না। গবেষকরা জোর দিয়ে বলেছেন যে একজন নেতার সাফল্য অনেক কিছুর উপর নির্ভর করে, কেবল তার হাতের ব্যবহারের উপর নয়। তবে এই গবেষণা ইঙ্গিত দিয়েছে যে বাঁহাতি হওয়ার মতো ব্যক্তিগত একটি বৈশিষ্ট্যও একজন সিইও’র সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং শেষ পর্যন্ত কোম্পানির সাফল্যের উপর একটি প্রভাব ফেলতে পারে।

উদ্ভাবন এবং নেতৃত্ব নিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাটি বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘সায়েন্সডাইরেক্ট’-এ প্রকাশিত হয়েছে।