“YouTube-ই হবে টিভির চেয়েও শক্তিশালী মাধ্যম”-পিয়ার্স মরগানের বিস্ফোরক মন্তব্য

প্রচলিত মিডিয়া বিশ্ব বর্তমানে ‘এক সমুদ্রপরিমাণ পরিবর্তনের’ মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের ফলে কিছু পরিচিত নাম হয়তো কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে, আবার কিছু ইউটিউব চ্যানেল আগামী দিনে টেলিভিশনের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবে – এমনই বিস্ফোরক এবং তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন বিশ্বখ্যাত উপস্থাপক ও সাংবাদিক পিয়ার্স মরগান। নানা সময়ে তীক্ষ্ণ মন্তব্য করে পরিচিত এই ব্যক্তিত্ব তার নিজস্ব মতামত প্রকাশে বরাবরই সরব।

সম্প্রতি টেলিভিশন মাধ্যম ছেড়ে স্ট্রিমিং মিডিয়ার জগতে প্রবেশ করেছেন পিয়ার্স মরগান। নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলের এই নতুন উদ্যোগের জন্য তহবিল সংগ্রহের একটি আলোচনা সভায় তিনি বলেছেন যে, শ্রোতা-দর্শকদের মিডিয়া উপভোগের অভ্যাস খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এবং তার মতে, টিভি জগতের বহু প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব শীঘ্রই তাকে অনুসরণ করে স্ট্রিমিং পরিষেবার দিকে ঝুঁকে পড়বেন।

এই পরিবর্তনটিকে তিনি একটি ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে তুলনা করেছেন। মরগান বলেন, “এই পরিবর্তনটি আসলে হবে যখন লোকজন ভিনাইল রেকর্ড শোনা ছেড়ে ডিজিটাল মিউজিকে চলে এসেছিল, ঠিক তখনকার মতো। মানুষ ভেবেছিল, এই পরিবর্তনে সম্ভবত দীর্ঘ সময় লাগবে।” কিন্তু আদতে তা হয়নি, হাতে তুড়ি বাজিয়ে মরগান বোঝান, “অথচ লোকজন ঠিক এইভাবে (চুটকি বাজানোর ভঙ্গিতে) শিফট করেছে।”

ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে মরগান কিছু কঠোর পূর্বাভাস দিয়েছেন। তিনি বলেন, “যুক্তরাজ্যে কিছু দৈনিক পত্রিকার অস্তিত্বই থাকবে না। ১০ বছর পরে আর কোনো ছাপা সংস্করণ (print version) থাকবে বলে মনে হয়?” তিনি তরুণ প্রজন্মের অভ্যাস দিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানান, “৪৫ বছরের কম বয়সী কাউকে আমি ছাপা পত্রিকা কিনতে দেখি না। তাই ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করছে।” যারা এই ‘টিকটিক’ শব্দ শুনতে পাচ্ছে না, তাদের জন্য “খুবই বাজে রকমের চমক অপেক্ষা করছে” বলে তিনি সতর্ক করেন। পিয়ার্স মরগান এটিকে মিডিয়া জগতের জন্য “জেগে ওঠার শেষ সময়” বলে অভিহিত করেছেন।

মিডিয়া মোগল রুপার্ট মারডকের সংবাদমাধ্যম ‘নিউজ ইউকে’-র সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক কাজের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর মরগান এখন ‘পিয়ার্স মরগান আনসেন্সর্ড’ (Piers Morgan Uncensored) নামে একটি ইউটিউব চ্যানেল খুলেছেন। ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিন বছরের এই চুক্তির জন্য মরগান প্রায় পাঁচ কোটি পাউন্ড (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬৯৩ কোটি টাকা) পেয়েছিলেন।

মরগান জানিয়েছেন, প্রচলিত টেলিভিশন ছেড়ে স্ট্রিমিং পরিষেবায় ‘পুরোদমে’ কাজ করার সিদ্ধান্তটি তিনি মূলত তার চার সন্তানের কাছ থেকে পেয়েছেন। তিনি বলেন, “আমার বাচ্চারা সবাই ইউটিউব দেখে। খেলার লাইভ সম্প্রচার না থাকলে ওরা কেউই টেলিভিশন দেখে না।” তিনি বুঝতে পারেন, “এক বছর আগে আমি ছিলাম সেই আগের পুরোনো রুটিনে। রাত ৮টার লাইভ নিউজ শোতে যেতাম। অথচ ওই জীবন টেনে নেওয়ার আমার কোনো দরকারই ছিল না।”

বর্তমানে মিডিয়াজুড়ে ইউটিউবের প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের জনপ্রিয় সম্প্রচার মাধ্যম ‘আইটিভি’ ও ‘চ্যানেল ফোর’-এর বহু উপস্থাপক এখন এই প্ল্যাটফর্মটিতে বিভিন্ন ধরনের কনটেন্ট আপলোড করছেন। পডকাস্টাররাও নিয়মিতভাবে তাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠান ইউটিউবেই আপলোড করছেন।

ইউটিউবের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানও এর ক্রমবর্ধমান প্রভাবের সাক্ষ্য দেয়। ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসে (Q1) কেবল বিজ্ঞাপন থেকেই ইউটিউবের আয় হয়েছে প্রায় ৮৯০ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে, ২০২৩ সালের পুরো বছরে ‘চ্যানেল ফোর’-এর মোট আয় ছিল প্রায় ১০০ কোটি পাউন্ড।

গত বছরের (২০২৪ সালের) মার্কিন নির্বাচনের দিকে ইঙ্গিত করে মরগান একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ইউটিউব জানিয়েছিল যে সে বছর ভোটের দিন কেবল যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন সম্পর্কিত কনটেন্ট দেখেছেন সাড়ে চার কোটিরও বেশি মানুষ। যেখানে সেই সন্ধ্যায় ১৮টি কেবল ও সম্প্রচার নেটওয়ার্ক মিলিয়ে গড়ে দর্শকসংখ্যা ছিল মাত্র ৪ কোটি ২৩ লাখ। তিনি স্বীকার করেন এই পরিসংখ্যানের সরাসরি তুলনা চলে না, কিন্তু এরপরও যদি কেউ না বুঝতে পারে যে মানুষের নজর কোথায় যাচ্ছে, তাহলে আর কী হতে পারে?

পিয়ার্স মরগান আরও জানিয়েছেন যে, সাংবাদিকতা জগতের বেশ কিছু শীর্ষ নাম তার সঙ্গে যোগাযোগ করে আলোচনা করার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছেন যে, তারাও কীভাবে নিজেদের প্রচলিত মাধ্যম থেকে এই নতুন প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসতে পারেন। তিনি মনে করেন, প্রচলিত বিভিন্ন মিডিয়া কোম্পানিগুলোর উচিত তার এবং তার মতো ইউটিউবে আসা অন্যান্য ব্যক্তিত্বদের দিকে তাকানো এবং ভাবা যে, “এই লোকগুলো কেন ইউটিউবের দুনিয়ায় চলে যাচ্ছে?” তিনি বিশ্বাস করেন, তিনি যা করছেন, আগামী দিনে আরও অনেক সাংবাদিক ও উপস্থাপক তাই করবেন। তিনি সাংবাদিকদের কাছ থেকে এ বিষয়ে “অনেক মজার মজার ফোন পাচ্ছেন” বলেও উল্লেখ করেন।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে মরগান বলেন, গ্যারি লিনেকারের ‘গোলহ্যাঙ্গার প্রোডাকশনস’-এর মতো কিছু করার পরিকল্পনা করছেন তিনি। ‘গোলহ্যাঙ্গার প্রোডাকশনস’ যুক্তরাজ্যে সফল পডকাস্ট সিরিজের জন্য পরিচিত। ‘মরগান আনসেন্সরড’ ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে সত্যিকারের অপরাধ (True Crime), ইতিহাস ও খেলাধুলার মতো নানা ঘরানার খবর কভার করে এমন বিভিন্ন চ্যানেল তৈরি করতে চান তিনি। তবে এ কাজের জন্য কেবল ব্রিটেন নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র সহ গোটা বিশ্বের দর্শকদের টার্গেট করেছেন মরগান। এমনকি তিনি দর্শক শ্রোতাদের ভৌগোলিক পরিচয়কে তার এই পরিকল্পনার সঙ্গে ‘প্রায় অপ্রাসঙ্গিক’ বলেও বর্ণনা করেছেন, যা প্রচলিত মিডিয়ার চিন্তা ভাবনার বাইরে।