রাতে ঘুমানোর সময় মুখে টেপ লাগানোর এই ভাইরাল ট্রেন্ডটি কি আসলেই উপকারী, না কি মস্ত বড় ভুল?

বিশ্বকাপের উত্তেজনায় কাঁপছে গোটা বিশ্ব। এই সময়ে ফুটবল তারকাদের ব্যক্তিগত জীবন, খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে ঘুমের রুটিন—সবকিছুই চলে আসে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। নরওয়ের তারকা ফুটবলার আর্লিং হালান্ড রাতে ঘুমানোর সময় মুখে টেপ বা ফিতে লাগিয়ে ঘুমান—এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে ভাইরাল।
এভাবে মুখ বন্ধ করে ঘুমানোর প্রধান সুবিধা হলো এটি একমাত্র নাক দিয়ে শ্বাস নিতে বাধ্য করে। টিকটক কিংবা ইনস্টাগ্রামের মতো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো এই প্রবণতাকে দারুণ জনপ্রিয় করে তুললেও, ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের মতো বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলো জোর দিয়ে বলছে যে এ বিষয়ে ক্লিনিক্যাল গবেষণা এখনও খুবই সীমিত। বর্তমানে এর বেশিরভাগ সুবিধাই কেবল ব্যক্তিগত বা পার্সোনাল অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে প্রচার করা হচ্ছে। চলুন জেনে নেওয়া যাক মুখে টেপ লাগিয়ে ঘুমানোর প্রচলিত কিছু উপকারিতা ও এর পেছনের সত্যতা সম্পর্কে—
মুখে টেপ লাগিয়ে ঘুমানোর আলোচিত উপকারিতাসমূহ
বাতাস পরিশোধন: নাক দিয়ে শ্বাস নিলে তা ফুসফুসে পৌঁছানোর আগেই বাতাস থেকে ধূলিকণা, অ্যালার্জেন এবং বিভিন্ন বায়ুবাহিত ক্ষতিকর কণা প্রাকৃতিকভাবে ছেঁকে যায়।
তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ: নাকের নিজস্ব গঠনতন্ত্র ভেতরে প্রবেশ করা বাতাসকে উষ্ণ ও আর্দ্র করে তোলে, যা গলার অস্বস্তি কমায় এবং ঘুমকে আরও বেশি স্বস্তিদায়ক করে।
নাক ডাকা কমায়: মুখ বন্ধ থাকলে শ্বাসনালী অনেক বেশি স্থিতিশীল থাকে, যা গলার নরম টিস্যুগুলোকে অতিরিক্ত কাঁপতে বাধা দেয় এবং নাক ডাকা কমায়।
নাইট্রিক অক্সাইড বৃদ্ধি: নাক দিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস নিলে শরীরে নাইট্রিক অক্সাইডের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, যা রক্তনালীকে প্রসারিত করতে এবং কোষে অক্সিজেন সঞ্চালন উন্নত করতে সাহায্য করে।
মুখ শুকিয়ে যাওয়া প্রতিরোধ: মুখ খোলা রেখে ঘুমালে লালা শুকিয়ে যায়, যা মূলত ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে আমাদের শরীরের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে।
নিঃশ্বাসের উন্নতি: লালার স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় থাকলে ব্যাকটেরিয়ার অতিরিক্ত বৃদ্ধি রোধ হয়, ফলে সকালে ঘুম থেকে উঠলে মুখে আর তীব্র দুর্গন্ধ তৈরি হয় না।
দাঁত রক্ষা: মুখের ভেতরের অংশ পর্যাপ্ত আর্দ্র থাকলে দাঁতের ক্ষয় এবং মাড়ির রোগের জন্য দায়ী অম্লীয় পরিবেশ বা অ্যাসিডের প্রভাব অনেকটাই কমে যায়।
চিকিৎসকদের মারাত্মক সতর্কবার্তা
বিখ্যাত হার্ভার্ড হেলথ (Harvard Health)-এর চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা চিকিৎসকের সঙ্গে কোনো ধরনের পরামর্শ না করে হুট করে এই পদ্ধতিটি নিজে নিজে চেষ্টা করার বিরুদ্ধে তীব্র সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
আপনার যদি অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া (OSA), নাকের হাড় বাঁকা থাকা (Deviated Septum) বা তীব্র অ্যালার্জির সমস্যা থেকে থাকে, তবে রাতে মুখ টেপ দিয়ে আটকে রাখলে তা আপনার অক্সিজেন গ্রহণকে মারাত্মকভাবে সীমিত করে দিতে পারে। ফলে এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রতিবন্ধকতা বা সাফোকেশন সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো এই দাবির পক্ষে কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই যে, মাউথ টেপিংয়ের মাধ্যমে চোয়ালের আকৃতি পরিবর্তন করা বা মুখের ফেসিয়াল স্ট্রাকচার বদলে ফেলা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের জরুরি পরামর্শ
আপনি যদি তবুও মাউথ টেপিং নিয়ে কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পরিকল্পনা করে থাকেন, তবে সাধারণ স্কচটেপ বা ঘরের সাধারণ টেপ ভুলেও ব্যবহার করবেন না। এর পরিবর্তে সর্বদা ছিদ্রযুক্ত, সংবেদনশীল ত্বকের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ মেডিকেল টেপ (যেমন মাইক্রোপোর টেপ) ব্যবহার করুন। তবে যেকোনো নতুন অভ্যাস গড়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াটাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।