রোজ রসুন খেলেই কি কোলেস্টেরল নিমিষেই গায়েব হয়? ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশনের এই সত্যটা না জানলে বড় বিপদে পড়বেন!

রসুন যুগ যুগ ধরে আমাদের রান্নাঘরের অপরিহার্য উপাদান এবং ঐতিহ্যবাহী ঘরোয়া প্রতিকার উভয় হিসেবেই অত্যন্ত সমাদৃত। খাবারের স্বাদ দ্বিগুণ বাড়ানো থেকে শুরু করে এর দারুণ সব স্বাস্থ্য উপকারিতার জন্য প্রশংসিত হওয়া পর্যন্ত, হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় রসুন একটি প্রাকৃতিক উপায় হিসেবে দারুণ খ্যাতি অর্জন করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত এবং জনপ্রিয় দাবিগুলোর একটি হলো—রসুন খেলেই নাকি রক্তের কোলেস্টেরল কমে যায়!
কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিচারে এই দাবিটি ঠিক কতখানি সত্য? রসুন কি সত্যিই প্রাকৃতিকভাবে কোলেস্টেরল কমাতে পারে, নাকি এটি কেবল একটি বহুল প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা?
ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশন (British Heart Foundation)-এর মতে, রসুন কোলেস্টেরলের ওপর কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব ফেললেও, এর উপকারিতা অত্যন্ত সীমিত বা সামান্য। সুষম ডায়েটে এটি একটি অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর খাবার হিসেবে যোগ হতে পারে ঠিকই, তবে রক্তে উচ্চ কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের জন্য চিকিৎসকের নির্ধারিত ওষুধ বা অন্যান্য প্রমাণিত জীবনযাপনের পদ্ধতির বিকল্প হিসেবে একে কোনোভাবেই ব্যবহার করা উচিত নয়।
হৃদযন্ত্রের সুরক্ষায় রসুনকে কেন এত ভালো বলা হয়?
রসুনের মধ্যে বেশ কয়েকটি শক্তিশালী প্রাকৃতিক যৌগ রয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘অ্যালিসিন’ (Allicin)। যখনই তাজা রসুন থেঁতো বা কুচি করা হয়, তখনই এই বিশেষ যৌগটি তৈরি হয়।
অ্যালিসিনের মধ্যে রয়েছে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং প্রদাহ-বিরোধী বা অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি বৈশিষ্ট্য, যা আমাদের রক্তনালীগুলোকে যেকোনো ধরনের ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। গবেষকদের মতে, এই উপাদানগুলো শরীরে কোলেস্টেরল উৎপাদন এবং তা প্রক্রিয়াকরণের পদ্ধতিকেও নানাভাবে প্রভাবিত করতে পারে। যেহেতু শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেস হৃদরোগের অন্যতম প্রধান কারণ, তাই যে খাবারগুলো এই প্রক্রিয়াগুলো কমাতে সাহায্য করে, সেগুলো নিঃসন্দেহে হার্টের স্বাস্থ্য রক্ষায় দারুণ সহায়ক।
রসুন কি সত্যিই কোলেস্টেরল কমাতে পারে?
নিয়মিত রসুন খেলে তা মোট কোলেস্টেরল এবং ক্ষতিকর এলডিএল (LDL) কোলেস্টেরল সামান্য পরিমাণে কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে গবেষকদের মতে, রসুনের এই প্রভাব সাধারণত খুবই মৃদু ও সীমিত। এর সহজ অর্থ হলো, আপনার কোলেস্টেরলের মাত্রা যদি অনেক বেশি বেড়ে যায়, তবে কেবল রসুন খেয়ে তা নামিয়ে স্বাভাবিক পর্যায়ে আনার সম্ভাবনা খুবই কম।
বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, রসুনের আসল উপকারিতা তখনই পাওয়া যায় যখন এটিকে অন্যান্য স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাসের সঙ্গে মিলিয়ে খাওয়া হয়; যেমন—সুষম খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত ব্যায়াম করা এবং শরীরের স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা।
আপনার প্রতিদিন ঠিক কতটা রসুন খাওয়া উচিত?
কোলেস্টেরল কমানোর নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ঠিক কতটা রসুন খাওয়া প্রয়োজন, সে বিষয়ে চিকিৎসকদের কোনো আনুষ্ঠানিক বা সুনির্দিষ্ট সুপারিশ নেই। তবে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ কয়েক সপ্তাহ বা মাস ধরে রসুন বা রসুনের নির্যাস সেবন করলে কিছু সুফল মেলে। ফ্রন্টিয়ার্স ইন নিউট্রিশন জার্নালে প্রকাশিত ২০২৪ সালের একটি পর্যালোচনা বা রিভিউ অনুযায়ী, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে কিছু উপকারিতা পেতে দুই মাস ধরে প্রতিদিন ১০ গ্রাম রসুন খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তবে মনে রাখবেন, অতিরিক্ত রসুন খেলেই যে দ্বিগুণ ভালো ফল পাওয়া যাবে, বিষয়টি এমন নয়। আপনার দৈনন্দিন রান্নায় এক বা দুটি রসুনের কোয়া যোগ করাই যথেষ্ট। সবার এটি মনে রাখা জরুরি যে, রসুন কোনো অলৌকিক একক প্রতিকার হিসেবে কাজ করার চেয়ে একটি সামগ্রিক স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবেই সবচেয়ে চমৎকার কাজ করে।