গর্ভবতী মায়েদের জন্য চরম সতর্কবার্তা! হেপাটাইটিস বি ভাইরাস থেকে নবজাতককে বাঁচানোর উপায় জানেন কি?

হেপাটাইটিস বি হলো এমন একটি মারাত্মক ভাইরাস, যা শরীরে প্রবেশ করে মারাত্মক সংক্রমণ ঘটাতে পারে এবং লিভারের অপূরণীয় ক্ষতি করতে পারে। স্বাভাবিক বা সি-সেকশন—যেভাবেই ডেলিভারি হোক না কেন, প্রসবের আগে, প্রসবের সময় বা ঠিক প্রসবের পরেও এই ভাইরাস মায়ের দেহ থেকে নবজাতকের শরীরে ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে এটি কেবল রক্তের মাধ্যমেই ছড়ায় তা নয়, বরং বীর্য, যোনি স্রাব, লালা এবং শরীরের অন্যান্য তরলের মাধ্যমেও সংক্রমণের প্রবল সম্ভাবনা থাকে। তবে সৌভাগ্যের বিষয় হলো, সঠিক সময়ে টিকা নেওয়ার মাধ্যমে এই ভয়াবহ HBV সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব। আর সেই কারণেই চিকিৎসকরা সাধারণত গর্ভবতী নারীদের নিয়মিত হেপাটাইটিস বি পরীক্ষা করিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
শিশুর মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি কতটা?
মায়ের শরীরে এই সংক্রমণ থাকলে তা সন্তানের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা হেপাটাইটিস সি-এর তুলনায় অনেক বেশি। গর্ভবতী নারী যদি গত ৬ মাসের মধ্যে হেপাটাইটিস বি-তে আক্রান্ত হয়ে থাকেন (যাকে চিকিৎসকরা তীব্র সংক্রমণ বা অ্যাকিউট ইনফেকশন বলেন), তবে নবজাতকের এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত থাকে। অন্যদিকে, সংক্রমণটি যদি দীর্ঘমেয়াদী হয় বা ক্রনিক হেপাটাইটিস বি হিসেবে শরীরে বাসা বেঁধে থাকে, তবে শিশুর আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কিছুটা কমে ১০ থেকে ২০ শতাংশে দাঁড়ায়।
প্রসব পরবর্তী যত্ন ও সুরক্ষার উপায়
চিকিৎসাবিজ্ঞানে হেপাটাইটিস বি-এর কোনো স্থায়ী নিরাময় না থাকলেও, সঠিক সময়ে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিলে শিশুকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব। যদি কোনো নবজাতক শিশু জন্মের মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যে হেপাটাইটিস বি ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ এবং ‘হেপাটাইটিস বি ইমিউন গ্লোবুলিন’ নামক বিশেষ ইঞ্জেকশনটি পেয়ে যায়, তবে তার এই ভাইরাসে আক্রান্ত না হওয়ার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশের বেশি থাকে। সাধারণত শিশুদের প্রথম শটটি দেওয়া হলেও, ইমিউন গ্লোবুলিন কেবল তখনই দেওয়া হয় যখন মায়ের শরীরে HBV থাকার নিশ্চিত প্রমাণ বা জোরালো সন্দেহ থাকে। তবে শিশুকে সম্পূর্ণ ও সর্বোচ্চ সুরক্ষা দিতে হলে পরবর্তী ৬ মাসের মধ্যে ভ্যাকসিনের বাকি দুটি ডোজও সময়মতো সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক।
বুকের দুধ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে সতর্কতা
সাধারণত মায়ের হেপাটাইটিস বি থাকলেও চিকিৎসকরা শিশুকে নিরাপদে বুকের দুধ খাওয়ানোর অনুমতি দেন। তবে যদি কোনো কারণে স্তনবৃন্ত ফেটে যায় কিংবা রক্তপাত হয়, তবে সেই ক্ষত বা সমস্যা পুরোপুরি সেরে না ওঠা পর্যন্ত সাময়িকভাবে বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ রাখা উচিত। এই বিষয়ে কোনো ধরনের বিভ্রান্তি বা সংশয় থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বাঞ্ছনীয়।
টিকার সঠিক সময়সূচি ও চিকিৎসকদের পরামর্শ
আমেরিকান একাডেমি অফ পেডিয়াট্রিক্স (AAP)-এর সুপারিশ অনুযায়ী, সমস্ত সুস্থ নবজাতককে জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই হেপাটাইটিস বি ভ্যাকসিনের প্রথম শট দেওয়া উচিত। এরপর শিশুর বয়স ১ থেকে ২ মাস হলে দ্বিতীয় ডোজ এবং ৬ থেকে ১৮ মাস বয়সের মধ্যে তৃতীয় ডোজ দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। এদিকে, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (CDC)-র সাম্প্রতিক নির্দেশিকায় অভিভাবকদের বলা হয়েছে, এই টিকার নির্দিষ্ট সময়সূচি বা ডোজ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে নেওয়া উচিত।