অন্যের ক্ষতি বা বিপর্যয়ে মনে মনে খুশি হন? শ্যাডেনফ্রয়ডে-র এই ভয়ঙ্কর অন্ধকার সত্যিটা আপনাকে চমকে দেবে!

অফিসে বস একজন সহকর্মীকে বকছেন, অথচ আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা বাকিদের মুখে কোনো উদ্বেগের ছাপ নেই; বরং কারো কারো ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে অদ্ভুত এক তৃপ্তির হাসি। কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো তারকার কেলেঙ্কারি বা কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তির বিপদে অনেকেই মনে মনে চরম স্বস্তি অনুভব করেন। শুনতে অদ্ভুত বা অস্বস্তিকর লাগলেও, মনোবিজ্ঞানীদের মতে এটি মানুষের একটি জটিল কিন্তু সুপ্ত সামাজিক আবেগ।

জার্মান ভাষায় এই বিশেষ অনুভূতির একটি নির্দিষ্ট নাম রয়েছে—‘শ্যাডেনফ্রয়ডে’ (Schadenfreude)। যেখানে ‘শ্যাডন’ শব্দের অর্থ ক্ষতি বা দুঃখ এবং ‘ফ্রয়ডা’ অর্থ আনন্দ। অর্থাৎ, সহজ কথায় অন্যের দুর্ভাগ্য বা ব্যর্থতা দেখে মনে মনে আনন্দ পাওয়া।

🧠 কেন অন্যের ব্যর্থতায় ভালো লাগে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের মস্তিষ্ক স্বভাবতই নিজেকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতা রাখে। যখন নিজের চেয়ে বেশি সফল, জনপ্রিয় বা ক্ষমতাবান কাউকে হোঁচট খেতে দেখা যায়, তখন অবচেতনে মনে হতে পারে নিজের অবস্থান কিছুটা নিরাপদ হয়েছে।

আত্মমর্যাদার অভাব: যাদের আত্মবিশ্বাস বা আত্মমর্যাদা তুলনামূলক কম, তাদের মধ্যে এই অনুভূতি বেশি দেখা যায়। অন্যের পতন তখন সাময়িকভাবে তাদের নিজেদের অপূর্ণতা বা ব্যর্থতাকে আড়াল করে দেয়।

প্রতিযোগিতামূলক কর্মক্ষেত্র: অফিসের ইঁদুরদৌড়ে কোনো সহকর্মী ব্যর্থ হলে অবচেতনভাবেই মনে হতে পারে নিজের মূল্যায়নের সুযোগ বা গুরুত্ব বেড়ে গেল।

বিবর্তনীয় দৃষ্টিভঙ্গি: বিবর্তনবাদীদের মতে, আদিম যুগে প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর দুর্বলতা নিজের দলের টিকে থাকার সম্ভাবনা বাড়াত। সেই আদিম মানসিকতার কিছু অংশই আজও মানুষের মধ্যে সুপ্ত অবস্থায় রয়ে গেছে।

⚖️ শ্যাডেনফ্রয়ডে কি সবসময়ই খারাপ?
সব ক্ষেত্রে এই অনুভূতি নেতিবাচক নয়। কোনো দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি শাস্তি পেলে বা দীর্ঘদিন অন্যায় করা কেউ আইনের মুখোমুখি হলে মানুষ যে স্বস্তি পায়, তাকে সমাজবিজ্ঞানীরা ‘পোয়েটিক জাস্টিস’ বা ন্যায়বিচারের অনুভূতি হিসেবে দেখেন।

তবে সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন এই আনন্দ কেবল অন্যকে ছোট করা, অপমান করা বা কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রকাশ পায়। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, প্রথম যে অনুভূতিটি মনে আসে তা হয়তো স্বয়ংক্রিয়, কিন্তু সেই অনুভূতির পর আপনি ঠিক কী করেন—অন্যের কষ্টে আনন্দকে উস্কে দেন নাকি সহানুভূতি দেখান—সেখানেই আপনার আসল ব্যক্তিত্বের পরিচয় লুকিয়ে থাকে।

🛡️ এই নেতিবাচক অনুভূতি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন?
১. সহানুভূতি চর্চা করুন: অন্যের বিপদ দেখলে নিজেকে তার জায়গায় বসিয়ে ভাবুন। এই অভ্যাস সহানুভূতি বাড়ায় এবং নেতিবাচক আবেগ কমাতে সাহায্য করে।
২. তুলনা করা বন্ধ করুন: প্রতিনিয়ত অন্যের সাফল্য বা ব্যর্থতার সঙ্গে নিজের জীবন মেলালে ঈর্ষা ও শ্যাডেনফ্রয়ডের মতো অনুভূতি জন্ম নেয়। মনে রাখবেন, প্রত্যেকের জীবন ও চলার পথ আলাদা।
৩. নিজের অনুভূতিকে চিনুন: কারো দুর্ভাগ্যে মনে সাময়িক আনন্দ এলে নিজেকে অপরাধী না ভেবে সেটি স্বীকার করুন এবং সচেতনভাবে ভাবুন যে পরিস্থিতিটি আরও মানবিকভাবে দেখা যায় কি না।
৪. কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন: নিজের জীবনের ভালো দিকগুলো নিয়ে সন্তুষ্ট থাকুন। অন্যের খারাপ অবস্থাকে নিজের সাফল্য হিসেবে না ভেবে, নিজের প্রাপ্তির জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন।

দীর্ঘদিন ধরে এসব মানসিক দ্বন্দ্বের কারণে যদি আত্মবিশ্বাস কমতে থাকে বা উদ্বেগ বাড়তে থাকে, তবে পেশাদার মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সেলরের সহায়তা নেওয়া সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *