স্বর্গের আশায় ১৯০ শিশুর মৃত্যু, ধর্মীয় নেতার ২০০ বছরের জেল, জানুন ঘটনা?

পৃথিবীর শেষ সময় নাকি ঘনিয়ে এসেছে, আর এই নরক থেকে বেঁচে ফেরার একমাত্র পথ স্বর্গে যাওয়া! তবে সেই স্বর্গে প্রবেশাধিকার পেতে হলে পরিবার ও সন্তানদের নিয়ে না খেয়ে অনাহারে জীবন বিসর্জন দিতে হবে—এমনই চরম অন্ধবিশ্বাস ও শয়তানের ফাঁদ পেতেছিলেন কেনিয়ার এক ভণ্ড ধর্মীয় নেতা। সেই কাল্ট গুরুর প্ররোচনা ও অত্যাচারে প্রাণ হারিয়েছেন ১৯০ জন শিশুসহ মোট ১৯১ জন অনুসারী। এই হাড়হিম করা ঘটনার চূড়ান্ত বিচারে তাঁকে ২০০ বছরের কারাদণ্ডের নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির আদালত।
গত শুক্রবার (৬ নভেম্বর) কেনিয়ার উপকূলীয় শহর মোম্বাসার একটি আদালত বিতর্কিত ধর্মীয় নেতা পল ম্যাকেঞ্জিকে ২০০ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেন। এর ঠিক দুই সপ্তাহ আগে ১৯০ জন অবোধ শিশুসহ ১৯১ জনকে নৃশংসভাবে অনাহারে রেখে হত্যার দায়ে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করেছিলেন বিচারক। অনাহারে আত্মহত্যার প্ররোচনা ও হত্যার জন্য ১০০ বছর এবং সরাসরি খুনের ঘটনায় আরও ১০০ বছর—সব মিলিয়ে মোট ২০০ বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে তাকে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করে জানান, পল ম্যাকেঞ্জি তাঁর পরিচালিত ‘গুড নিউজ ইন্টারন্যাশনাল চার্চ’-এর আড়ালে একটি চরমপন্থী খ্রিষ্টান ধর্মীয় গোষ্ঠী গড়ে তুলেছিলেন। সেখানে তিনি অনুসারীদের মগজধোলাই করে বলতেন, পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার আগেই নিজেদের ও সন্তানদের অনাহারে রেখে মৃত্যু বরণ করতে হবে, তবেই সোজা স্বর্গে পৌঁছানো যাবে।
কেবল প্ররোচনাই নয়, অনুসারীরা যাতে এই নির্দেশ অমান্য না করতে পারে, তার জন্য ম্যাকেঞ্জি ও তার সহযোগীরা ভয়ভীতি ও শারীরিক নির্যাতনের আশ্রয় নিত। নির্দেশ মেনে না খেয়ে থাকতে না চাইলে অনুসারীদের বেধড়ক মারধর ও নির্যাতন করা হতো, যাতে বাধ্য হয়ে তারা অনাহারে থাকে।
২০২৩ সালে গোপন সূত্রে খবর পেয়ে কেনিয়া পুলিশ পল ম্যাকেঞ্জিকে গ্রেফতার করে। এর কয়েক সপ্তাহ পর দক্ষিণ-পূর্ব কেনিয়ার শাকাহোলা বনের গহীনে চালানো হয় এক বিশাল তল্লাশি অভিযান। সেখানে অগভীর গণকবর ও শৌচাগারের গর্ত থেকে একের পর এক পচাগলা মরদেহ উদ্ধার হতে শুরু করে, যা দেখে আঁতকে ওঠেন তদন্তকারীরা। এমনকি কয়েকজনকে জীবিত অবস্থায় গণকবরে পুঁতে ফেলারও অকাট্য প্রমাণ মেলে।
শাকাহোলা বনের সেই শয়তানের আস্তানা থেকে এ পর্যন্ত মোট ৪০০টিরও বেশি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে মরদেহের অধিকাংশই মারাত্মকভাবে পচে যাওয়ায় মাত্র ২৬ জনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এদিকে, ওই বনাঞ্চলে আরও ২০০ জনেরও বেশি মানুষের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে এখনো জোরকদমে তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ।
আদালতে অবশ্য পল ম্যাকেঞ্জি তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং দাবি করেন তিনি কাউকে অনাহারে থাকতে বাধ্য করেননি। তবে বিচারক সেই সাফাই পুরোপুরি খারিজ করে দিয়ে ১৯১ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর দায়ে তাকে দোষী সাব্যস্ত করেন।
তদন্তে আরও জানা যায়, ২০১৯ সালে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন ম্যাকেঞ্জির বিতর্কিত চার্চটি বন্ধ করে দেয়। কিন্তু এর পর সে পালিয়ে শাকাহোলা বনে আস্তানা গাড়ে। সেখানে অনুসারীদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে এবং অসুস্থ হলে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতেও নিষিদ্ধ করেছিল সে। স্কুল ও হাসপাতালকে সরাসরি ‘শয়তানের প্রতিষ্ঠান’ বলে আখ্যা দিত এই ভণ্ড ধর্মগুরু।
ম্যাকেঞ্জির বিরুদ্ধে বর্তমানে সন্ত্রাসবাদসহ আরও একাধিক গুরুতর মামলা বিচারাধীন। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থাতেও কোয়া বিনজারো গ্রামের ৫২ জনের মৃত্যুর নির্দেশ দিয়েছিল সে।
কেনিয়ার ইতিহাসেও এই ঘটনা অন্যতম কালিমালিপ্ত অধ্যায়। শাকাহোলা বনের এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে চার্চ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কড়া নজরদারি ও কঠোর আইন প্রণয়নের জোর দাবি উঠেছে।