কালীপুজোয় ১ গ্লাস জল নাকি ১৫-২০টা সিগারেট? কলকাতার বাতাস নিয়ে ডাক্তারের বিস্ফোরক তথ্যে হাড়হিম!

কালীপুজো ও দীপাবলির আনন্দ কাটতে না কাটতেই প্রতি বছর এক ঘন ধোঁয়াশার চাদরে ঢেকে যায় তিলোত্তমা। নিষিদ্ধ বাজি পোড়ানোর তাণ্ডব এবং লাগামহীন বায়ুদূষণের জেরে পরিস্থিতি এমন এক আশঙ্কাজনক জায়গায় পৌঁছে যায়, যা সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনছে। বিগত ৩ বছরের খতিয়ান বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, কালীপুজোর দিন ও তার পরবর্তী সময়ে কলকাতা এবং পার্শ্ববর্তী শহরতলির বাতাস মারাত্মকভাবে বিষাক্ত হয়ে উঠছে। এই বিষয়ে এক বৈদ্যুতিন সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বিস্ফোরক তথ্য তুলে ধরেছেন বিশিষ্ট চিকিৎসক সংযুক্তা দত্ত।

“দিল্লির ঠিক পাশেই এসে দাঁড়ায় কলকাতা”
শহরের এই আশঙ্কাজনক বায়ুদূষণ প্রসঙ্গে চিকিৎসক সংযুক্তা দত্ত অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে জানিয়েছেন, “প্রতি বছর শীতের শুরুতেই আমাদের এই সতর্কবার্তা দিতে হয়। কারণ বছরের এই সময়টাতে কলকাতার বাতাসে বিষের মাত্রা বিপজ্জনক জায়গায় পৌঁছয়। বায়ুদূষণের কথা উঠলেই সবাই দিল্লির দিকে তাকান। সার্বিকভাবে সারা বছরের হিসেবে দিল্লি শীর্ষস্থানে থাকলেও, শীতকালে এবং বিশেষ করে কালীপুজোর দিনে দিল্লির ঠিক পাশেই এসে দাঁড়ায় আমাদের তিলোত্তমা কলকাতাও।”

সদ্যজাত শিশুও গিলছে ১৫-২০টি সিগারেটের বিষ!
কলকাতার বাতাসে কতটা বিষ জমা হয়েছে, তা বোঝাতে গিয়ে চিকিৎসক এক ভীতিপ্রদ তথ্য শেয়ার করেন। তাঁর ভাষায়, “সহজভাবে বোঝাতে গেলে, কালীপুজোর দিনে শহরের দূষণের যে অবস্থা দাঁড়ায়, তাতে সদ্যোজাত এক বাচ্চাকে যদি টানা ১৫ থেকে ২০টা সিগারেট খাওয়ানো হয়— পরিস্থিতি ঠিক তেমনই তৈরি হয়! বায়ুদূষণের মাধ্যমে আমরা প্রতিদিন কমবেশি ১৫-২০টি সিগারেট ধূমপানের সমান বিষ নিজেদের অজান্তেই শরীরে নিচ্ছি। ধনী হোক বা গরিব— শহরের প্রতিটি মানুষের সঙ্গেই একই ঘটনা ঘটছে।”

দূষণের পারদ আকাশছোঁয়া: বিগত ৩ বছরের চিত্র
বিগত ৩ বছরের কালীপুজোর দিনের বায়ুদূষণের সূচক বা এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI) নজর করলে দেখা যায়, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল থেকে শুরু করে রবীন্দ্র সরোবর বা যাদবপুর— একাধিক পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রেই দূষণের মাত্রা স্বাভাবিকের থেকে বহুগুণ বেড়ে যায়। বাতাসে ভেসে থাকা ক্ষতিকর সূক্ষ্ম ধূলিকণা (PM 2.5 এবং PM 10)-এর মাত্রা বিপদসীমা ছাড়িয়ে এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে, সাধারণ মানুষ স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাস নিতেও কষ্ট পাচ্ছেন।

তথ্য বলছে, গত বছর দীপাবলির দিন মধ্যরাতের মধ্যে কলকাতার গড় বায়ুর গুণমান সূচক (AQI) প্রায় ৩.৫ গুণ বেড়ে ১২৭ (Moderate) থেকে ৪৩৪ (Severe)-এ গিয়ে ঠেকেছিল। যাদবপুর ও ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের মতো কিছু এলাকায় দূষণের মাত্রা সর্বোচ্চ ৫০০ স্পর্শ করেছিল, যা পরিমাপের সর্বোচ্চ সীমা।

উৎসবের পরের দিনও শহরের বিভিন্ন মনিটরিং স্টেশনে PM2.5 এবং PM10 ধূলিকণার মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেশি ছিল। যাদবপুরে AQI ছিল ২০৪ (Poor), বালিগঞ্জে ১৭৩, এবং সিঁথির রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ১৩৪ রেকর্ড করা হয়।

এই স্বাস্থ্যসংকট থেকে বাঁচার উপায় কী?
এই চরম স্বাস্থ্যসংকট থেকে বাঁচতে চিকিৎসকদের স্পষ্ট বক্তব্য— ব্যক্তিগত ও সামাজিক সচেতনতাই এর একমাত্র সমাধান। কেবল সরকার বা প্রশাসনের দিকে আঙুল না তুলে প্রতিটা মানুষকে বুঝতে হবে, আমরা নিজেরাই এই বিষাক্ত পরিস্থিতির জন্য দায়ী।

রোগব্যাধি ও ফুসফুসের চিরস্থায়ী ক্ষতি এড়াতে কিছু জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন:

নিষিদ্ধ বাজির তাণ্ডব পুরোপুরি বন্ধ করা এবং পরিবেশবান্ধব প্রদীপ ও আলোর উৎসব পালন করা।

গাড়ির ফিটনেস ও নিয়মিত ধোঁয়া পরীক্ষা (Pollution Check) করানো।

বয়স্ক ও শিশুদের জন্য প্রয়োজনে বিশেষ মাস্কের ব্যবহার এবং শীতের সকালে খোলা বাতাসে বেরোনোর ক্ষেত্রে সতর্কতা।

সচেতনতার এই বার্তা যদি শহরের প্রতিটা কোণায় সময় থাকতে না পৌঁছয়, তবে আগামী দিনগুলোতে শীতের শুরুতে কলকাতা সত্যিই এক আস্ত গ্যাস চেম্বারে পরিণত হবে বলে আশঙ্কা চিকিৎসকদের।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *