৫০ বছর ধরে এই গ্রামে ফোটে না একটাও বাজি! দীপাবলিতে সম্পূর্ণ নীরবতার নেপথ্যে কোন অলৌকিক কাহিনী?

দীপাবলি বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আলোর রোশনাই আর চারিদিকে বাজির হইচই। লক্ষ্মী বোম, অ্যাটম বোম, থাউজেন্ড ওয়ালা কিংবা রকেটের বিকট শব্দ ছাড়া যেন এই উৎসব অনেকের কাছেই অসম্পূর্ণ। আওয়াজ যত বেশি, উৎসবের আমেজও তত বেশি—এমনটাই প্রচলিত ধারণা। তবে এই সব চেনা ছবির সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা যায় ভারতের এক বিশেষ গ্রামে, যেখানে গত ৫০ বছর ধরে একটা বাজি ফাটানো তো দূরের কথা, কোনো শুভ অনুষ্ঠানেও শব্দ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ! কোথায় এই গ্রাম? আর কেনই বা এমন অদ্ভুত নীরবতার মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয় আলোর উৎসব?
কোন গ্রামে পালিত হয় এই ‘শব্দহীন’ দীপাবলি?
তামিলনাড়ুর ধর্মপুরী জেলার বল্লেনাহল্লি গ্রামে দীপাবলির উদযাপন এক অনন্য নজির গড়েছে। দেশের অন্য সব প্রান্তের মানুষের মতো এই গ্রামের অধিবাসীরাও ফুল, রঙোলি এবং প্রদীপের আলোয় নিজেদের ঘরদোর সাজিয়ে তোলেন। কিন্তু উৎসবের আনন্দে মেতে উঠলেও তাঁরা একটি বাজি বা পটকাও ফাটান না। গত প্রায় পাঁচ দশক ধরে এই গ্রামের মানুষেরা পরম শান্তিতে ‘নীরব দীপাবলি’ পালন করে আসছেন। কোনো সরকারি নির্দেশ নয়, বরং পরিবেশের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং পশুপাখির প্রতি অগাধ ভালোবাসা থেকেই গ্রামবাসীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বাদুড়দের সুরক্ষাতেই বাজিতে নিষেধাজ্ঞা!
বল্লেনাহল্লি গ্রামে মানুষের বসতির পাশাপাশি শত শত বছর ধরে বাস করছে বিপুল সংখ্যক বাদুড়। গ্রামের বড় বড় গাছে গাছে ঝুলতে দেখা যায় হাজার হাজার বাদুড়কে। পুরুষানুক্রমে এই বাদুড়দের সাথেই বড় হয়েছেন গ্রামবাসীরা। স্থানীয় মানুষদের বিশ্বাস, এই বাদুড়রা স্রেফ কোনো সাধারণ প্রাণী নয়, বরং তারা ঈশ্বরের রূপ এবং গ্রাম রক্ষা করার বিশেষ দূত। তাই এই বোবা প্রাণীদের সুরক্ষায় নিজেদের বাজির আনন্দ অনায়াসে বিসর্জন দিয়েছেন তাঁরা।
যে ঘটনার পর চিরতরে বদলে যায় গ্রামের নিয়ম:
গ্রামের প্রবীণদের কথায়, বহু বছর আগে অন্য সব গ্রামের মতোই এখানেও দীপাবলিতে দেদার বাজি ফাটানো হতো। কিন্তু একবার বাজির প্রচণ্ড বিকট শব্দে আতঙ্কিত হয়ে গ্রামের সমস্ত বাদুড় একসঙ্গে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যায়। অদ্ভুতভাবে, তার পরপরই নাকি গোটা গ্রামে নেমে আসে একের পর এক চরম বিপর্যয় ও দুর্যোগ। গ্রামবাসীরা যখন মারাত্মক দুর্দশায় দিন কাটাচ্ছিলেন, তার কিছুদিন পর আবার বাদুড়েরা গ্রামে ফিরে আসে—আর অলৌকিকভাবেই কেটে যায় গ্রামের সমস্ত বিপদ!
এই ঘটনার পর থেকেই বাদুড়দের ‘গ্রামের রক্ষক’ হিসেবে মানতে শুরু করেন সকলে এবং সিদ্ধান্ত নেন যে ওদের শান্তিতে কোনো বিঘ্ন ঘটতে দেওয়া যাবে না। সেই থেকেই বন্ধ হয়ে যায় বাজি পোড়ানোর রীতি।
বিয়ে থেকে নববর্ষ—বাজি ফাটানো সম্পূর্ণ বারণ
মজার বিষয় হলো, বল্লেনাহল্লি গ্রামে শুধু দীপাবলি নয়, নববর্ষ, কোনো বৈবাহিক অনুষ্ঠান বা যেকোনো ধর্মীয় শুভ উৎসবের দিনেও বাজি ফাটানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বাদুড় বা অন্য কোনো পাখির ক্ষতি হতে পারে, এমন যেকোনো কাজের তীব্র বিরোধিতা করেন এলাকার বাসিন্দারা। সাধারণ পশুপাখির ভালোবাসায় নিজেদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য বদলে ফেলে বল্লেনাহল্লির মানুষ বিশ্বজুড়ে পরিবেশ সচেতনতার এক বিরল ও অনন্য নজির স্থাপন করেছেন।