ভূত চতুর্দশীতে ভূত তাড়ানোর গোপন অস্ত্র! এই লঙ্কার এক কামড়েই হুশ ওড়ে বাঘা বাঘা মানুষের?

ভূত চতুর্দশীতে ভূতেদের ভয় দেখাতে ঘরে ঘরে ১৪ প্রদীপ জ্বালানোর রেওয়াজ তো বহু পুরনো। কিন্তু ভূত-প্রেত বা অশরীরী তো দূর অস্ত, রক্তমাংসের মানুষও যদি একবার বিশ্বের অন্যতম সেরা এই লঙ্কার মুখোমুখি পড়ে, তবে আত্মারাম খাঁচাছাড়া হতে বাধ্য! কথা হচ্ছে মারকাটারি ঝালের জন্য বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করা ‘ভূত জলোকিয়া’ (Ghost Pepper) নিয়ে। যার ঝাঁঝ ও নামের রহস্য শুনলে চোখ কপালে উঠবে যে কারও।

কেন এমন অদ্ভুত নাম?

অরুণাচল প্রদেশের বমডিলার স্থানীয় ব্যবসায়ী সেরিং তেচি জানিয়েছেন, ভূত জলোকিয়ায় স্বয়ং ভূতেরও হাল খারাপ হয়ে যায় বলেই এর এমন নামকরণ। তবে ঐতিহাসিক তথ্য ঘাঁটলে জানা যায়, এই লঙ্কা মূলত ভুটানি ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে অসমে এসেছিল। অসমিয়া ভাষায় ভুটানিদের বলা হতো ‘ভোট’ বা ‘ভোটিয়া’ এবং ‘জোলোকিয়া’ মানে লঙ্কা। সেই সুবাদে এর আসল নাম ছিল ‘ভোট জোলোকিয়া’ বা ভুটানি লঙ্কা। কিন্তু মুখে মুখে তা বদলে গিয়ে হয়ে যায় ‘ভূত জোলোকিয়া’ বা ‘ভূত জলোকিয়া’। আন্তর্জাতিক স্তরে এর পোশাকি নাম ‘ঘোস্ট পিপার’।

পাশাপাশি লোককথা রয়েছে, এই লঙ্কার তীব্র ঝাল মানুষকে এমনভাবে কাবু করে যে মনে হয় তাকে আক্ষরিক অর্থেই ‘ভূতে ধরেছে’। এ ছাড়াও এর লালচে, থ্যাবড়ানো ও কোঁচকানো চেহারা দূর থেকে অনেকটাই ভূতের মুখের মতো দেখায়।

কতটা মারাত্মক এর ঝাল?

লঙ্কার ঝালের তীব্রতা মাপা হয় স্কোভিল হিট ইউনিট বা SHU-এর মাধ্যমে। সাধারণত বাঙালি রান্নায় ব্যবহৃত কাঁচা লঙ্কার SHU থাকে ৫ হাজার থেকে ৩০ হাজারের মধ্যে। আর সেখানে ভূত জলোকিয়ার ঝালের মাত্রা ১০ লক্ষেরও বেশি SHU! (তথ্য উইকিপিডিয়া সূত্রে প্রাপ্ত)।

প্রখ্যাত ফুড ব্লগার ইন্দ্রজিৎ লাহিড়ী থেকে শুরু করে সেলেব্রিটি শেফ রণদীপ ব্রার— অনেকেই এই লঙ্কার চ্যালেঞ্জ নিয়ে রীতিমতো হিমশিম খেয়েছেন। সাধারণ মানুষ তো দূরে থাক, এর এক টুকরো মুখে দিলেই হু হা করে চোখ দিয়ে জল গড়ায়।

শত্রু তাড়ানো থেকে চোর কাবু— ভূত জলোকিয়ার ক্যারিশমা

শুধু খাওয়ার জন্যই নয়, অতীতে যুদ্ধের ময়দানে অস্ত্র হিসেবেও এর জুড়ি মেলা ভার ছিল।

  • নাগা মরিচ ও যুদ্ধাস্ত্র: নাগা যোদ্ধারা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে এটি ব্যবহার করত। কুকি উপজাতির যোদ্ধারা প্রাচীনকালে যুদ্ধ ঘোষণা করতে জ্বলন্ত কাঠের গুঁড়ির সঙ্গে এই লঙ্কা বেঁধে শত্রু গ্রামে পাঠিয়ে দিত। ব্রিটিশ বিরোধী লড়াইয়েও এটি ব্যবহৃত হয়েছিল।

  • হাতি তাড়াতে ধোঁয়া: অসমে ফসলের ক্ষেত নষ্ট করা বুনো হাতি তাড়াতে এই লঙ্কা পুড়িয়ে ধোঁয়া দেওয়ার প্রচলন রয়েছে। বর্তমানে ভারতীয় সেনা শত্রু রুখতে এই লঙ্কা দিয়ে তৈরি পিপার স্প্রে বা চিলি গ্রেনেড ব্যবহার করে।

  • কলকাতার চোর কাহিনি: শোনা যায়, কলকাতার দক্ষিণ শহরতলির এক বাড়িতে পাহাড়ি লঙ্কা গাছ থেকে এক রাতে চোর ঢুকেছিল। ভুল করে লঙ্কা গাছে হাত দেওয়ায় সারা রাত বাগানের মাটিতে হাত ঘসে জ্বালা কমানোর চেষ্টা করতে হয়েছিল তাকে!

স্বাদ ও স্বাস্থ্যেও অনন্য

ঝালের পাশাপাশি এই লঙ্কার একটি আলাদা স্বতন্ত্র স্বাদ রয়েছে। কাঁচা অবস্থায় অতিরিক্ত ঝাল হলেও, এটি শুকিয়ে আচার বা সস তৈরি করে খাওয়ার চল বিশ্বজুড়ে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে ‘ঘোস্ট পেপার’-এর আচার ও সস বেশ জনপ্রিয় একটি ব্র্যান্ড। লিভারের সুরক্ষায় দিনে সামান্য পরিমাণে এই লঙ্কা খাওয়ার উপযোগিতার কথাও বলেন অনেকে।

চেহারা, নাম ও মারকাটারি ঝালের রহস্যে মোড়া এই ভূত জলোকিয়া যে কাউকে ঘায়েল করার ক্ষমতা রাখে। তা হলে ভূত চতুর্দশীতে একটু ভৌতিক আমেজ পেতে এক টুকরো ভূত জলোকিয়া চেখে দেখবেন নাকি?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *