রাশন-পেনশনের জন্য আধার আর গ্রাহ্য নয়? কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর এক ঘোষণাতেই দেশজুড়ে শোরগোল!

জনকল্যাণমূলক সরকারি প্রকল্পের সুফল পেতে আধার নাকি ভোটার কার্ড—কোনটি আসল নথি হিসেবে গ্রাহ্য হবে, তা নিয়ে এক নতুন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্কের জন্ম হয়েছে। পঞ্চায়েতিরাজ ও পশুপালন মন্ত্রকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রাজীব রঞ্জন সিং ওরফে লালন সিংহের পর পর কয়েকটি বিতর্কিত বক্তব্য সামনে আসতেই সুর চড়িয়েছে বিরোধীরা। সাধারণ মানুষের কাছে ঠিক কোন নথির ভিত্তিতে সরকারি পরিষেবা ও আর্থিক সাহায্য পৌঁছবে, তা নিয়েই এখন দেশের প্রশাসনিক মহলে তীব্র জল্পনা।
কী বলেছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী?
গ্যাংটকের সিকিম কোঅপারেটিভ মিল্ক প্রডিউসার্স ইউনিয়নের একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখার সময় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জানান, সরকারি পঞ্চায়েতিরাজ প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের প্রকৃত পরিচয় যাচাই করতে এবং অর্থ পৌঁছতে আধার আর প্রাথমিক মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে না। তার বদলে ‘ইলেকটরস ফটো আইডেন্টিটি কার্ড’ (EPIC) বা ভোটার পরিচয়পত্র এবং বায়োমেট্রিক তথ্যকেই মূল মাপকাঠি করা হবে।
Scroll.in
দিল্লিতেও অনুরূপ মন্তব্য করে মন্ত্রী যুক্তি দেন, “আজকাল মোড়ের মাথায় মোড়ের মাথায় ৫ মিনিটে আধার কার্ড তৈরি হয়ে যাচ্ছে। ফলে ভুয়া সুবিধাভোগীর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে।” তাঁর দাবি, ভোটার আইডি ও বায়োমেট্রিক তথ্য মিলিয়ে টাকা দিলে প্রকৃত যোগ্য ব্যক্তিরাই সুবিধা পাবেন এবং মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালদের কারচুপি বন্ধ করা যাবে।
www.financialexpress.com
তবে বিতর্কের মুখে পড়ে পরবর্তীতে এক স্পষ্টীকরণে মন্ত্রী জানান, পরিচয় শনাক্তকরণের প্রক্রিয়ায় আধার একবারে বাদ যাচ্ছে না, ভোটার কার্ড ও বায়োমেট্রিক-ভিত্তিক আধার ভেরিফিকেশন দুটোই পরিপূরক হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
www.financialexpress.com
“এ তো হকের চুরি!”—তোপ রাহুল গান্ধীর
কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর এই বক্তব্যের কড়া ভাষায় সমালোচনা করেছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব হয়ে তিনি দাবি করেন, এ এক গভীর চক্রান্ত। রাহুলের অভিযোগ, “ভোটের আগে স্পেশাল ইন্টেন্সিভ রিভিশন (SIR)-এর নামে কোটি কোটি প্রান্তিক নাগরিকের নাম ভোটার তালিকা থেকে ছাঁটাই করা হচ্ছে। আর এবার যদি সেই ছাঁটাই হওয়া ভোটার তালিকাই নির্ধারণ করে যে কে সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাবেন, তবে লক্ষ লক্ষ দরিদ্র মানুষ তাঁদের মৌলিক অধিকার হারাবেন।”
রাহুল আশঙ্কা প্রকাশ করে প্রশ্ন তোলেন, “আজ পঞ্চায়েতিরাজ প্রকল্প দিয়ে শুরু হচ্ছে, কাল কি রেশন, পেনশন, ১০০ দিনের কাজ (MGNREGA), প্রধানমন্ত্রী আবাসন যোজনা ও স্কলারশিপের ক্ষেত্রেও এই একই শর্ত চাপানো হবে?” বিরোধী দলনেতার বক্তব্য, ভোট দেওয়া নাগরিকের মৌলিক অধিকার, কোনও শর্ত নয়; কোনও দরিদ্র মানুষের পেনশন তাঁর ভোটার কার্ডের কাছে জিম্মি থাকতে পারে না।
সিপিএমের আশঙ্কা ও ১৩.৪ কোটি ভোটারের প্রশ্ন
একই সুর শোনা গেছে সিপিএমের পলিটব্যুরোর বার্তাতেও। তাদের দাবি, বিশেষ রিভিশন বা SIR প্রক্রিয়ার ফলে ইতোমধ্যেই প্রায় ১৩.৪ কোটির বেশি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে—যাঁদের বড় অংশই মুসলিম, মহিলা, তপশিলি ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল সম্প্রদায়ের মানুষ। এহেন পরিস্থিতিতে ভোটার আইডি বাধ্যতামূলক করা হলে কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলির আওতা আরও সংকুচিত হয়ে পড়বে।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকার কথা উল্লেখ করে বিরোধীরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, ভোটার তালিকায় নাম না থাকা কখনওই সরকারি সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হতে পারে না।
চূড়ান্ত নির্দেশিকার অপেক্ষা
এদিকে ২০২৬-৩১ সালের আর্থিক মেয়াদের জন্য পঞ্চায়েত ব্যবস্থা এবং স্থানীয় স্বশাসিত সংস্থাগুলির উন্নয়নকল্পে ষোড়শ অর্থ কমিশন ৪ লক্ষ ৩৫ হাজার ২৩৬ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ সুপারিশ করেছে। তবে শেষ পর্যন্ত কোন সরকারি প্রকল্পে কোন নথির ব্যবহার বাধ্যতামূলক হবে, সে বিষয়ে অর্থ বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের চূড়ান্ত কোনও নোটিফিকেশন না আসা পর্যন্ত ধোঁয়াশা কাটছে না।