বিসর্জনের আগে মশালের আলোয় দেবীর উদ্দাম নাচ! নদিয়ার শান্তিপুরের বিখ্যাত বামাকালীর অলৌকিক রহস্য জানুন

নদিয়ার ঐতিহাসিক শান্তিপুর মানেই যেমন বৈষ্ণব সংস্কৃতি ও প্রাচীন তাঁতশিল্পের মেলবন্ধন, তেমনই এই প্রাচীন মাটি বহন করে চলেছে তন্ত্রসাধনা ও কালীপুজোর বহু রোমাঞ্চকর ইতিহাস। শান্তিপুরের বহু প্রাচীন পুজোর মধ্যে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ও জনপ্ৰিয় হলো ‘বামাকালী’। বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়া বা মোবাইল রিলসের যুগে কালীকাপ্রসাদ ভট্টাচার্যের বিখ্যাত গান “একবার নাচো, নাচো গো শ্যামা নাচো এমন করে”-র সাথে যে দেবীর মহাধুমধামে নাচের দৃশ্য ভেসে ওঠে, তিনিই হলেন নদিয়ার শান্তিপুরের এই ঐতিহ্যবাহী বামাকালী। বিসর্জনের আগে মশালের আলোয় হাজার হাজার ভক্তের কাঁধে দেবীর এই অলৌকিক নৃত্যের দৃশ্য দেখতে প্রতিবছর দূর-দূরান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল নামে শান্তিপুরে।

এই বামাকালী পুজোর ইতিহাস নিয়ে ইতিহাসবিদ ও স্থানীয়দের মধ্যে কিছু মতভেদ রয়েছে। অনেকের মতে, এই পুজো প্রায় ৫০০ বছরের প্রাচীন। আবার অন্য একটি তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৯ সালে ঘটপুজোর মাধ্যমে এর আনুষ্ঠানিক সূচনা হয় এবং ১৯৭০ সালে প্রথম মৃণ্ময়ী প্রতিমায় পুজো শুরু করা হয়। সাধারণ সনাতন ধর্মে আমরা দেবী দক্ষিণাকালীর মূর্তিতে দেখতে পাই যে তিনি শিবের বুকে তাঁর ডান পা বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। তবে শান্তিপুরের এই মূর্তিতে দেবী শিবের বুকে তাঁর বাম পা রেখে অবস্থান করছেন। এই অতি দুর্লভ ও বিশেষ ভঙ্গির কারণেই দেবী ‘বামাকালী’ নামে বিশ্বখ্যাত। দেবীর হাতে খড়্গ, গলায় মুণ্ডমালা আর মুখমণ্ডলে ফুটে ওঠা প্রদীপ্ত তেজ যেন অশুভ শক্তি বিনাশের এক চরম প্রতীক।

এই ঐতিহ্যবাহী পুজোর সূচনার নেপথ্যে রয়েছে যমুনা চৌধুরী নামের এক ভক্তের কাহিনি। প্রচলিত লোককথা অনুযায়ী, যমুনা দেবী স্বপ্নে মহামায়ার অলৌকিক দর্শন পেয়েছিলেন। দেবী তাঁকে স্বপ্নাদেশ দিয়ে তাঁর আরাধনা শুরু করার নির্দেশ দেন। এক ভক্তের প্রাপ্ত সেই স্বপ্নাদেশকে কেন্দ্র করেই পরবর্তীতে শান্তিপুরের বুকে আজ গড়ে উঠেছে এক বিরাট ধর্মীয় উৎসব।

তবে প্রযুক্তির এই যুগে আধুনিকতা বনাম প্রাচীন ঐতিহ্যের এক অবিশ্বাস্য দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে এই বামাকালী পুজো। যেখানে অন্যান্য পুজোয় ঝকমকে এলইডি এবং বৈদ্যুতিক আলোর ঝলকানি দেখা যায়, সেখানে বামাকালীর পুজোয় মণ্ডপ থেকে শুরু করে প্রতিমা নিরঞ্জন পর্যন্ত বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ! প্রদীপ, মোমবাতি, ঐতিহ্যবাহী হ্যাজাক ও মশালের আলোতেই সম্পন্ন হয় দেবীর আরাধনা।

পুজোর সবচেয়ে রোমাঞ্চকর মুহূর্তটি আসে বিসর্জনের দিনে। বিসর্জনের আগে বিশাল দেবীমূর্তিকে একটি বিশেষ বাঁশের কাঠামোর উপর স্থাপন করা হয়। এরপর অসংখ্য ভক্ত সম্মিলিতভাবে সেই ভারী কাঠামো কাঁধে তুলে নেন। ঢাক, কাঁসর-ঘণ্টার কানফাটা গর্জন, মশালের আলো আর হাজার হাজার মানুষের উলুধ্বনি ও জয়ধ্বনির মাঝে ভক্তদের কাঁধেই নাচতে থাকেন দেবী বামাকালী। আধ্যাত্মিকতা, ভক্তি এবং প্রাচীন লোকগাঁথার এই অপূর্ব মিলন শান্তিপুরের বামাকালী পুজোকে আজ বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য ও জনপ্রিয় স্থান এনে দিয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *