শরীরে একাধিক ভাঙা হাড় নিয়ে মৃত্যুঝুঁকিতে ১৮ মাসের হস্তিশাবক! কেরল থেকে সোজাসুজি এয়ারলিফ্ট করে গুজরাতের বনতারায়

শরীরের একাধিক হাড় ভেঙেছে, তার ওপর ফুসফুসে হাড়হিম সংক্রমণ। টানা চিকিৎসা ও ফিজিওথেরাপি সত্ত্বেও শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটেছিল কেরলের অভয়ারণ্যের মাত্র ১৮ মাস বয়সী খুদে হস্তিশাবক ‘মায়া’-র। শারীরিক অবস্থা এতটাই আশঙ্কাজনক যে, পা তুলে দাঁড়ানোর ক্ষমতাটুকুও হারিয়েছিল সে। অবশেষে মুমূর্ষু এই বাচ্চা হাতিটির জীবন বাঁচাতে কেরল থেকে সোজাসুজি এয়ারলিফ্ট করে গুজরাতের জামনগরে রিলায়েন্সের আন্তর্জাতিক মানের বন্যপ্রাণী সেবা কেন্দ্র ‘বনতারা’ (Vantara)-য় নিয়ে আসা হলো।
কেরল বন বিভাগের চিফ ওয়াইল্ডলাইফ ওয়ার্ডেন ড. পি. পুগাজেন্দি (IFS) গত ৫ নভেম্বর এই বিশেষ স্থানান্তরের জরুরি নির্দেশ দেন। বর্তমানে বনতারার বিশেষ ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (ICU) রাখা হয়েছে মায়াকে, যেখানে বিশিষ্ট পশু চিকিৎসকরা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে তার চিকিৎসা চালাচ্ছেন।
মা হারা সদ্যোজাত থেকে দুর্ঘটনাকবলিত মায়া
মায়ার জীবনসংগ্রামের ইতিহাস শুরু থেকেই বেশ কণ্টকাকীর্ণ। ২০২৫ সালের ১৯ এপ্রিল কেরলের মালয়াত্তুরের কাপরিক্কড়ের কাছে নদী পার হওয়ার সময় হাতির পাল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে সদ্যোজাত মায়া। ডিহাইড্রেশন বা তীব্র জলশূন্যতায় ভুগতে থাকা এই দুর্বল হস্তিশাবকটিকে উদ্ধার করে কেরলের বন বিভাগ। মায়ের প্রথম শালদুধ না পাওয়া মায়াকে দিনরাত বিশেষ পরিচর্যা দিয়ে বড় করে তুলছিলেন অ্যাসিস্ট্যান্ট ভেটারিনারি অফিসার ড. বিনয় সি বাবুর নেতৃত্বাধীন টিম।
তবে বিপত্তি ঘটে গত ২ জুলাই। অভয়ারণ্যে খেলতে খেলতে অসাবধানতাবশত পিছলে পড়ে গিয়ে ডান কাঁধে ও শরীরে মারাত্মক চোট পায় মায়া। পরবর্তীতে লিক্যুইড ফুড খাইয়ে এবং ফিজিওথেরাপি দিয়েও তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঠেকানো যায়নি। গত অক্টোবরের শেষে মায়ার সোজা হয়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতাও চলে যায়।
শরীরে হাড় ভাঙা ও সংক্রমণ: মেডিক্যাল বোর্ডের জরুরী সিদ্ধান্ত
পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক বুঝে গত ২৪ অক্টোবর পুকোড়ের ‘কলেজ অফ ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস’-এর বিশেষজ্ঞ ড. দীনেশ পি.টি মায়াকে পরীক্ষা করেন। এক্স-রে ও রক্তের রিপোর্টে দেখা যায়, দুর্বল হাড়ের কারণে মায়ার শরীরের একাধিক হাড় ইতিমধ্যেই ভেঙে গেছে, বুকে বাসা বেঁধেছে মারাত্মক সংক্রমণ এবং দীর্ঘক্ষণ শুয়ে থাকার কারণে শরীরে তৈরি হয়েছে জটিল ক্ষত।
এরপরই গত ৪ নভেম্বর একটি বিশেষ আন্তর্জাতিক মেডিক্যাল বোর্ডের বৈঠক বসে, যেখানে উপস্থিত ছিলেন অসমের প্রখ্যাত হাতি বিশেষজ্ঞ তথা বনতারার উপদেষ্টা ড. কুশল কোঙার শর্মা এবং বনতারার চিফ এলিফ্যান্ট কেয়ার ভেটেরিনারি ড. যদুরাজ খাড়পেকর। তাঁরা এক বাক্যে মায়াকে উন্নত পরিকাঠামো ও আধুনিক যন্ত্রপাতির সুবিধার জন্য দ্রুত বনতারায় এয়ারলিফ্ট করার পরামর্শ দেন।
এয়ারলিফ্ট ও বনতারায় ২৪ ঘণ্টার ইনটেনসিভ কেয়ার
মায়াকে বিশেষ বিমানে উড়িয়ে আনার সময় যাতে কোনো সমস্যা না হয়, তার জন্য বিমানেই লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম, জরুরি ওষুধ এবং তিনজন অভিজ্ঞ পশু চিকিৎসক ও পরিচর্যাকারীর বিশেষ টিম উপস্থিত ছিল। মায়া যাতে অচেনা পরিবেশে আতঙ্কিত না হয়ে পড়ে, তার জন্য কেরল বন বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট ফরেস্ট ভেটেরিনারি অফিসার ড. বিনয় সি. বাবু এবং মায়ার নিজস্ব মাহুত/পরিচর্যাকারী নিখিল বাবুকেও বনতারায় পাঠানো হয়েছে।
বনতারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মায়ার চিকিৎসার জন্য লেটেস্ট প্রযুক্তির পেইন ম্যানেজমেন্ট, বিশেষ হাইড্রোথেরাপি এবং অ্যাডভান্সড স্ক্যানিং সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। কেরলের বিশেষ সোশ্যাল ফরেস্ট্রি কমিটিও এই চিকিৎসার ওপর নজর রাখছে। সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠলে মায়াকে পুনরায় তার চেনা অভয়ারণ্যে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আপাতত ১৮ মাসের এই খুদে সদস্যের সুস্থ হয়ে ওঠার প্রার্থনায় দিন গুনছেন পশুপ্রেমীরা।