স্কুলে শিক্ষকের ৩.৫ লাখ পদ খালি, নেই শৌচাগার! জিডিপির মাত্র ২.৭% খরচে কতটা ধুঁকছে দেশের ভবিষ্যৎ?

আজকের ‘YOUR INDIA’ কলামে প্রখ্যাত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক সন্তোষ নায়ার খতিয়ে দেখেছেন, ভারত শিক্ষা খাতে প্রতি বছর ঠিক কত টাকা ব্যয় করে এবং কয়েক দশক ধরে জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষায় বরাদ্দের যে দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে আলোচনা চলছে, তা এখনও দেশের সার্বিক অগ্রগতির জন্য কেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রতিবেদনে শিক্ষা বাজেটের সঙ্গে শিক্ষক ঘাটতি, স্কুলের ভঙ্গুর পরিকাঠামো এবং শিশুদের শিক্ষার গুণগত মানের গভীর যোগসূত্রটি স্পষ্ট তুলে ধরা হয়েছে।

কোঠারি কমিশন থেকে ২০২৬: অধরাই রয়ে গেল ৬ শতাংশের স্বপ্ন

প্রায় ৬০ বছর আগে ১৯৬৪-৬৬ সালে গঠিত কোঠারি কমিশন আমেরিকা, জাপান এবং তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো উন্নত দেশের শিক্ষার মডেল খতিয়ে দেখে সুপারিশ করেছিল যে, ভবিষ্যৎ নিয়ে যে উন্নয়নশীল দেশ সত্যিই চিন্তিত, তাদের শিক্ষাখাতে অন্তত জিডিপির ৬ শতাংশ খরচ করা উচিত। সেই থেকে ভারতের একাধিক জাতীয় শিক্ষানীতিতে এই লক্ষ্যমাত্রার কথা বলা হলেও বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

কেন্দ্রীয় সরকারের নিজস্ব অর্থনৈতিক সমীক্ষা (২০২৩-২৪) অনুযায়ী, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার মিলিয়ে শিক্ষাখাতে ভারতের মোট ব্যয় জিডিপির মাত্র ২.৭ শতাংশ। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৭-১৮ থেকে ২০২৩-২৪ সাল পর্যন্ত এই বরাদ্দের হার ২.৭% থেকে ২.৯%-এর মধ্যেই বন্দি রয়েছে। এমনকী সামাজিক পরিষেবা খাতে মোট বাজেটের মধ্যেও শিক্ষার অংশ ২০১৭-১৮ সালে যেখানে ছিল ১০.৭ শতাংশ, সাম্প্রতিক বছরে তা কমে প্রায় ৯ শতাংশে এসে ঠেকেছে।

শ্রেণিকক্ষে সরাসরি প্রভাব: ৩.৫৭ লক্ষ শিক্ষকের পদ ফাঁকা!

দেশের জিডিপি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টাকার অঙ্কে শিক্ষা বাজেট বাড়লেও অর্থনীতির অনুপাতের বিচারে তা স্থবির হয়ে পড়েছে। অথচ ২৫ কোটিরও বেশি ভারতীয় শিশুর শিক্ষার চাহিদা এবং পাঠ্যক্রম দিন দিন আরও জটিল হচ্ছে।

বাজেটের এই অপ্রতুলতার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ শ্রেণিকক্ষে:

  • শিক্ষক সংকট: সারা দেশের সরকারি স্কুলগুলিতে প্রায় ৩.৫৭ লক্ষ শিক্ষকের পদ শূন্য হয়ে পড়ে রয়েছে।

  • পরিকাঠামোর অভাব: দেশের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ স্কুলে ন্যূনতম মৌলিক পরিকাঠামো ও কার্যকর শৌচাগার নেই।

  • পড়ুয়া-শিক্ষক অনুপাত: জাতীয় স্তরে খাতা-কলমে অনুপাত ঠিক মনে হলেও বহু নির্দিষ্ট জেলায় শ্রেণিকক্ষে পড়ুয়ার সংখ্যা মাত্রাতিরিক্ত।

ফিনল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়ার সাফল্য বনাম ভারতের চ্যালেঞ্জ

আন্তর্জাতিক স্তরে দক্ষিণ কোরিয়া বা ফিনল্যান্ডের মতো দেশগুলি যখন নিজেদের সর্বজনীন শিক্ষা পরিকাঠামো গড়ে তুলছিল, তখনই তারা জিডিপির ৪ থেকে ৫ শতাংশেরও বেশি অর্থ শিক্ষায় বিনিয়োগ করেছিল। ব্যবস্থা গড়ে ওঠার পর নয়, বরং গড় ওঠার সময়েই এই আর্থিক ভিত্তি তৈরি করা হয়েছিল। ভারত একই লক্ষ্য নিয়ে এগোলেও অর্থনীতির আকারের তুলনায় শিক্ষা বাজেটের ভিত অনেকটাই দুর্বল।

জিডিপির ৬ শতাংশ বরাদ্দ হলে কী কী আমূল পরিবর্তন সম্ভব?

শিক্ষা খাতে যদি সত্যিই কোঠারি কমিশনের সুপারিশ মেনে জিডিপির ৬ শতাংশ বরাদ্দ করা সম্ভব হয়, তবে বাজেটের পরিমাণ বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি হবে। সেক্ষেত্রে: ১. দেশে থাকা সমস্ত শূন্য শিক্ষকপদে একাধিকবার দ্রুত স্বচ্ছ নিয়োগ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। ২. যে বিদ্যালয়গুলিতে ন্যূনতম পরিকাঠামো নেই, সেগুলিতে আধুনিক শৌচাগার, পানীয় জল ও শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ সম্ভব হবে। ৩. শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং প্রাথমিক স্তরে শিশুদের পড়া ও গণিতের মৌলিক দক্ষতা বাড়াতে জাতীয় স্তরে মেগা প্রজেক্ট চালু করা যাবে।

প্রতিটি বাজেটে নাগরিকদের নজর রাখা উচিত শিক্ষাখাতে বরাদ্দের হার বাড়ছে নাকি নীরব পতন ঘটছে, কারণ এই একটি সংখ্যার ওপরই নির্ভর করছে দেশের আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *