১৮ বছর বয়সে যা কেউ ভাবেনি, ১৯২৬-এ সেটাই করেছিলেন তিনি! ভারতের প্রথম মহিলা পরিচালকের রোমাঞ্চকর বায়োপিকে ঋতুপর্ণা

ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসের এক বিস্মৃত এবং প্রাক-সবাক যুগের বৈপ্লবিক অধ্যায় এবার জীবন্ত হতে চলেছে সেলুলয়েডে। দেশের প্রথম মহিলা পরিচালক ফাতিমা বেগমের জীবন, লড়াই এবং সিনেমা-যাত্রাকে কেন্দ্র করে তৈরি হতে চলেছে নতুন বাংলা ছবি ‘ফাতমা’। অরোরা ফিল্ম কর্পোরেশনের প্রযোজনায় এই ছবির নামভূমিকায় অভিনয় করছেন টলিউডের বর্ষীয়ান অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। ছবিটি পরিচালনা করছেন প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক অতনু রায়, যাঁর হাত ধরে চলচ্চিত্র পরিচালনায় তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটতে চলেছে।

‘বুলবুল-এ-পারিস্তান’-এর শতবর্ষ ও এক হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস

১৯২৬ সালে মুক্তি পেয়েছিল ফাতিমা বেগম পরিচালিত ঐতিহাসিক নির্বাক ছবি ‘বুলবুল-এ-পারিস্তান’। আগামী দিনে সেই ছবি নির্মাণের শতবর্ষ উদযাপিত হতে চলেছে। আর সেই মাইলফলক উপলক্ষেই আত্মপ্রকাশ করতে চলেছে ‘ফাতমা’। পরিচালকের মতে, এটি নিছক কোনও বাঁধাধরা বায়োপিক নয়; বরং নতুন প্রজন্মের কাছে ভারতীয় সিনেমার এক অজানা ইতিহাসকে পুনরুদ্ধার করার একটি আন্তরিক প্রয়াস।

১৯০০ সালে মুম্বইতে (তৎকালীন বম্বে) এসে প্রথমে অভিনেত্রী হিসেবে নিজের কাজ শুরু করেছিলেন ফাতিমা বেগম। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি গড়ে তোলেন নিজস্ব প্রযোজনা সংস্থা ‘ফাতিমা ফিল্মস’ এবং একটি পূর্ণাঙ্গ স্টুডিও। ১৯২৬ সালে যখন নারীদের অভিনয়ে আসার অনুমতিই সমাজ দিত না এবং পুরুষেরা নারী সেজে অভিনয় করতেন, সেই যুগে দাঁড়িয়ে নিজ দায়িত্বে ছবি নির্মাণ করে নজির গড়েছিলেন তিনি। তৎকালীন সময়ের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে দাঁড়িয়েও তিনি হাতে তৈরি অপটিক্যাল ট্রিকস, মিনিয়েচার সেট এবং হাতে ঘোরানো ক্যামেরার মতো বৈপ্লবিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিলেন।

পর্দায় নির্বাক থেকে সবাক যুগ: ঋতুপর্ণার নতুন চ্যালেঞ্জ

ছবিটিতে ১৯২০-এর দশকের নির্বাক চলচ্চিত্রের আমল থেকে শুরু করে সবাক চলচ্চিত্রের যুগে পদার্পণের পুরো সময়কালকেই ক্যামেরাবন্দি করা হবে। ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তকে দেখা যাবে বিভিন্ন সময়ের কালানুক্রমিক লুকে।

প্রকল্পটি নিয়ে উচ্ছ্বসিত ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত জানান, “নির্বাক থেকে সবাক চলচ্চিত্রের আমল—সম্পূর্ণ সময়টাই এই ফ্রেমে ফুটিয়ে তোলা হবে। আমার লুক ও সাজসজ্জাও বিভিন্ন দশকের নিয়ম মেনেই তৈরি হচ্ছে। অরোরা ফিল্মস ‘রাইকমল’, ‘জলসাঘর’-এর মতো কালজয়ী সিনেমা এবং সম্প্রতি ‘কালকক্ষ’ বা ‘অদম্য’-র মতো প্রশংসিত ছবি প্রযোজনা করেছে। তাঁদের সঙ্গে কাজ করতে পেরে এবং এই নতুন ধারণার পাশে দাঁড়াতে পেরে অত্যন্ত ভালো লাগছে।”

কেন ঋতুপর্ণাকেই বেছে নেওয়া হলো?

ছবিটির মাধ্যমে ফাতিমা বেগমকে উপযুক্ত শ্রদ্ধা জানানো সম্ভব হবে বলে বিশ্বাস করেন নবাগত পরিচালক অতনু রায়। কিন্তু এই গুরুগম্ভীর চরিত্রের জন্য কেন ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত?

প্রশ্নটির উত্তরে পরিচালক অতনু রায় এক বাক্যে স্পষ্ট জানান, “ফাতিমা বেগমের মতো একজন ব্যক্তিত্বের চরিত্র এবং তার ওজন বহন করার ক্ষমতা এই মুহূর্তে আমাদের বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত ছাড়া আর কারও আছে বলে আমার মনে হয়নি। সেই বিশ্বাস থেকেই তাঁর কাছে যাওয়া।”

ফাতিমা বেগমের নিজস্ব স্টুডিওর ভাঙন, তাঁর নাইট্রেট ফিল্মের রিলগুলিতে অগ্নিকাণ্ডের ফলে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার মর্মান্তিক ঘটনা এবং তাঁর কন্যা জুবেইদার তৎকালীন ‘স্ক্রিন আইডল’ হয়ে ওঠার কাহিনি নিয়ে অরোরা ফিল্মসের এই মেগা উদ্যোগ ইতিমধ্যেই চলচ্চিত্রপ্রেমীদের নজর কাড়তে শুরু করেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *