লকার সারেন্ডার করে দিয়েছে ব্যাঙ্ক! অথচ বছরের পর বছর কেটেছে ভাড়া, ৪৭ লাখের গয়না উধাও হতেই বিরাট রায়

ব্যক্তিগত বা যৌথভাবে ব্যাঙ্কে লকার ভাড়া নিয়ে মূল্যবান সোনা-রুপো বা গয়না সুরক্ষিত রাখার চল রয়েছে বহু পরিবারেই। কিন্তু একদিন যদি হুট করে জানতে পারেন, আপনার ব্যাঙ্ক বহু আগেই সেই লকারটি সারেন্ডার বা বন্ধ করে দিয়েছে—অথচ তারপরেও আপনার অ্যাকাউন্ট থেকে নিয়মিত লকারের ভাড়ার টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে এবং লকারে থাকা ৪৭ লক্ষ টাকার গয়নাও উধাও, তবে আপনার ঠিক কী অবস্থা হবে? দিল্লির বাসিন্দা মিস মারওয়াহর সঙ্গে ঠিক এমনই এক অবিশ্বাস্য ও মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। শেষ পর্যন্ত এই ঘটনায় আইনি লড়াইয়ে বড়সড় জয় পেলেন ওই গ্রাহক।
লকার বন্ধ অথচ বছরের পর বছর কাটা হচ্ছিল ভাড়া!
১৯৯৮ সাল থেকে মিস মারওয়াহ তাঁর শ্বশুরের সঙ্গে দেশের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের শাখায় একটি যৌথ লকার ব্যবহার করতেন। ২০১০ সালের ২৯ অগাস্ট তাঁর শ্বশুরের মৃত্যুর পরও ২০১৩ সাল পর্যন্ত ব্যাঙ্ক নিয়মমাফিক সেই লকারের ভাড়া কেটে গেছে।
কিন্তু বিপত্তি বাধে ২০১৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর। ওই দিন মিস মারওয়াহ যখন লকারটি ব্যবহার করতে এবং তার ভিতরে থাকা জিনিসপত্র দেখতে ব্যাঙ্কে যান, তখন তাঁকে জানানো হয় যে ২০১৫ সালের ২২ জানুয়ারি ওই লকারটি নাকি আগেই সমর্পণ বা সারেন্ডার করা হয়েছে! অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, লকার সারেন্ডারের বিষয়ে ব্যাঙ্ক তাঁকে কোনোদিন কোনো নোটিস বা তথ্য দেয়নি। উল্টে গ্রাহককে না জানিয়েই লকারটি অন্য কাউকে বরাদ্দ করে দেওয়া হয়েছিল এবং তাঁর কাছ থেকে প্রতি বছর ভাড়াও আদায় করা হচ্ছিল।
দিল্লি কনজিউমার কমিশনের ঐতিহাসিক রায়
এই চরম হেনস্তা ও প্রতারণার প্রতিকার চেয়ে মিস মারওয়াহ দিল্লি স্টেট কনজিউমার ডিসপিউটস রিড্রেসাল কমিশনের দ্বারস্থ হন। সমস্ত দিক বিচার করে কমিশন পরিষ্কার জানিয়ে দেয় যে, ব্যাঙ্কের এই আচরণ স্পষ্টতই ‘পরিষেবায় ত্রুটি’ (Deficiency in Service)-র শামিল।
ব্যাঙ্ক নিজেদের সাফাইয়ে জানায় যে লকারটি অনেক আগেই সারেন্ডার করা হয়েছিল এবং ভাড়ার টাকা কেটে নেওয়াটা ‘অনিচ্ছাকৃত ভুল’। কিন্তু ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ আদালতের কাছে লকার সারেন্ডারের কোনো সঠিক রসিদ, গ্রাহকের লিখিত আবেদনপত্র কিংবা লকারের ভিতরে ঠিক কী কী মূল্যবান জিনিসপত্র ছিল, তার কোনো উপযুক্ত প্রমাণ বা নথি পেশ করতে পারেনি।
গ্রাহকের পক্ষে রায় দিয়ে দিল্লি কনজিউমার কমিশন ব্যাঙ্ককে কড়া নির্দেশ দিয়েছে:
-
লকারে থাকা গয়নার সম্পূর্ণ মূল্য বাবদ ৪৭ লক্ষ টাকা ফেরত দিতে হবে।
-
২০১৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী এই টাকার উপর বার্ষিক ৬ শতাংশ সরল সুদ দিতে হবে।
-
মানসিক যন্ত্রণা ও হয়রানির ক্ষতিপূরণ এবং মামলা পরিচালনার খরচ বাবদ অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করতে হবে। সব মিলিয়ে ব্যাঙ্ককে প্রায় ৫০.৫ লক্ষ টাকারও বেশি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ব্যাঙ্ক কি গ্রাহককে না জানিয়ে লকার বন্ধ করতে পারে?
বিশেষজ্ঞ আইনজীবীদের মতে, কোনো ব্যাঙ্কই গ্রাহককে না জানিয়ে নিঃশব্দে লকার বন্ধ বা সারেন্ডার করে দিতে পারে না। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (RBI)-র নির্দেশিকা অনুযায়ী, লকার চুক্তি বাতিল করা বা লকার খোলার আগে নির্দিষ্ট আইনি পদ্ধতি ও আগাম নোটিস দেওয়া বাধ্যতামূলক। লকার সারেন্ডার সম্পূর্ণভাবে একটি দ্বিপাক্ষিক প্রক্রিয়া, যেখানে লিখিত নোটিস এবং স্বাধীন সাক্ষীদের উপস্থিতি আবশ্যক। গ্রাহকের দীর্ঘ নীরবতাকে কখনওই লকার সমর্পণের সম্মতি হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না।