AI খেয়েছে ১.২১ লাখ চাকরি! ক্ষোভে ফুঁসছে আমেরিকা, মার্কিন নির্বাচনের ফলেই কি বন্ধ হতে চলেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা?

আমেরিকায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) নিয়ে শুরু হয়েছে এক নজিরবিহীন আইনি ও রাজনৈতিক যুদ্ধ! একদিকে বড় বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলি খরচ কমাতে এবং কাজের গতি বাড়াতে দেদার AI ব্যবহার করছে, অন্যদিকে এই প্রযুক্তির কারণে ব্যাপক হারে চাকরি যাওয়া এবং বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ও জল অপচয়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন সাধারণ মার্কিন নাগরিকরা। এবার সেই জমে থাকা জনরোষের সরাসরি প্রভাব পড়ল মার্কিন রাজনীতির ময়দানে।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত মার্কিন মিডটার্ম নির্বাচনে ক্ষমতাসীন ডেমোক্র্যাটিক পার্টি এক বিশাল জয় নথিভুক্ত করেছে। মার্কিন সংসদের দুই কক্ষ— সেনেট এবং হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস— দুটিতেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে তারা। টেক্সাস, জর্জিয়া, ওহাইও এবং নেভাডার মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলিতেও ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা গভর্নর পদে জয়ী হয়েছেন। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই বিজয়ী প্রার্থীদের অনেকেই প্রচার পর্বে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তারা নতুন AI ডেটা সেন্টার তৈরিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করবেন কিংবা লাগাম টানবেন। ফলে টেক জায়ান্টদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ।
১. AI-এর অজুহাতে ১.২১ লাখেরও বেশি চাকরি ছাঁটাই!
আউটপ্লেসমেন্ট ফার্ম Challenger, Gray & Christmas-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে অক্টোবর ২০২৬-এর মধ্যে মার্কিন সংস্থাগুলি ১,২১,৪০১টি চাকরি বাতিলের নেপথ্যে সরাসরি AI-কে দায়ী করেছে। এটি এই সময়ে হওয়া মোট ৬.১৭ লাখ ছাঁটাইয়ের প্রায় ২০ শতাংশ!
২০২৩ সাল থেকে পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, AI-এর কারণে ঘোষিত ছাঁটাইয়ের সংখ্যা ২০২৩ সালে ছিল ৪,২৪৭, ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১২,৭৪২ এবং ২০২৫ সালে লাফিয়ে পৌঁছে যায় ৫৪,৮৩৬-এ। ২০২৩ থেকে ২০২৬-এর অক্টোবর পর্যন্ত এই সংখ্যা ছুঁয়েছে প্রায় ১.৯৩ লাখ। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজারের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও মন্দাও এই ছাঁটাইয়ের একটি বড় কারণ।
২. নির্বাচনের প্রধান ‘খলনায়ক’ কেন ডেটা সেন্টার?
AI মডেল চালানোর জন্য প্রয়োজন সুবিশাল ডেটা সেন্টারের। সেখানে হাজার হাজার সার্ভার দিনরাত চালু রাখতে এবং সেগুলিকে ঠান্ডা রাখতে কোটি কোটি লিটার জল ও বিপুল বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা— এর ফলে তাঁদের বিদ্যুতের বিল আকাশ ছোঁয়া হবে, পানীয় জলের সংকট দেখা দেবে এবং তীব্র পরিবেশ দূষণ ঘটবে।
রিপোর্ট বলছে, অন্তত ২১টি নির্বাচনী লড়াইয়ে এই ধরনের ক্ষতিকারক ডেটা সেন্টার নির্মাণের গতি শ্লথ করা বা পুরোপুরি বন্ধ করার দাবিতে প্রায় ৯ কোটি ডলারের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল। একটি সমীক্ষায় তিন- চতুর্থাংশ মার্কিন নাগরিক নিজেদের এলাকায় ডেটা সেন্টার গড়ে তোলার তীব্র বিরোধিতা করেছেন। এমনকি নির্বাচনে জয়ী ৩৪ জন গভর্নরের মধ্যে ৩২ জনই ডেটা সেন্টার নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন আনার পক্ষে মত দিয়েছেন।
৩. ধাক্কা খেল টেক শেয়ার, কোন কোন রাজ্যে বদল?
টেক্সাস, জর্জিয়া ও ওহাইও-র মতো অঙ্গরাজ্যগুলিতে পরিবেশ সুরক্ষায় কঠোর বার্তা দিয়েছেন বিজয়ী ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা:
টেক্সাস: বিজয়ী ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি স্পষ্ট জানিয়েছেন, স্থানীয় মানুষের সম্মতি না থাকলে কোনো নতুন প্রজেক্টকে ছাড়পত্র দেওয়া হবে না।
জর্জিয়া: বিদ্যুৎ ও পানীয় জলের খরচের সার্বিক পর্যালোচনা না হওয়া পর্যন্ত ডেটা সেন্টারের কাজ স্থগিত রাখার দাবি তোলা হয়েছে।
ওহাইও: সংস্থাগুলিকে বিদ্যুৎ-জলের পুরো খরচ বহন করা এবং কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অর্থনৈতিক সংস্থা Goldman Sachs-এর অনুমান অনুযায়ী, রাজ্যগুলির এই বিধিনিষেধের কারণে আমেরিকায় প্রস্তাবিত প্রায় ৪৫% ডেটা সেন্টার সম্প্রসারণের কাজ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। নির্বাচন পর্ব মেটার পরপরই Core Scientific-এর শেয়ার ১১.৬% এবং IREN-এর শেয়ার ১২.৫% হ্রাস পেয়েছে।
৪. তবে কি বন্ধ হয়ে যাবে AI-এর বিকাশ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেমোক্র্যাটদের এই জয়ে AI প্রযুক্তি পুরোপুরি নিষিদ্ধ হয়ে যাবে না। তবে রাজ্য সরকারগুলি জল-বিদ্যুতের ছাড়পত্র, স্থানীয় অনুমোদন ও পরিবেশ সুরক্ষার নিয়ম অত্যন্ত কঠোর করতে চলেছে।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে AI শিল্প প্রসারের বড় সমর্থক এবং চীনকে প্রযুক্তিগত লড়াইয়ে পেছনে ফেলতে আমেরিকা কোনোভাবেই AI থমকে যেতে দেবে না। তাই আসল লড়াই AI বন্ধ করার নয়— লড়াইটি হলো, কোন শর্তে এবং স্থানীয় মানুষের অধিকার সুনিশ্চিত করে ডেটা সেন্টার তৈরি হবে, সেই নীতি নির্ধারণ করা!