ইন্দোনেশিয়ার ঘনে জঙ্গলে ভারতীয় প্যারা কমান্ডোদের রক্তগরম করা ড্রিল! ‘গরুড় শক্তি’র মহড়ায় থরথর করে কাঁপল শত্রুপক্ষ

ইন্দোনেশিয়ার ব্যাঙ্গুওয়াঙ্গির দুর্গম ও ঘন জঙ্গলে বিগত কয়েক দিন ধরে চলা ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার যৌথ স্পেশাল ফোর্সেস সামরিক মহড়া ‘গরুড় শক্তি-২০২৬’ (Garud Shakti-2026) বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন হলো। দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে আয়োজিত এই দ্বিপাক্ষিক যৌথ সামরিক মহড়ার এটি ছিল একাদশতম (11th Edition) সংস্করণ। গত ২৭ অক্টোবর থেকে শুরু হয়ে ৫ নভেম্বর পর্যন্ত চলা এই হাই-ভোল্টেজ মহড়ায় ভারতীয় সেনার এলিট প্যারাশুট রেজিমেন্টের (স্পেশাল ফোর্সেস) এবং ইন্দোনেশিয়ান স্পেশাল ফোর্সেসের (TNI-AD) অকুতোভয় জওয়ানরা অংশগ্রহণ করেছিলেন।

এই যৌথ সামরিক মহড়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল দুই বন্ধু রাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক কৌশলগত সমন্বয় বৃদ্ধি করা, একে অপরের অপারেশনাল কৌশল আদান-প্রদান করা এবং যৌথভাবে জটিল সামরিক অভিযান পরিচালনার সক্ষমতাকে আরও জোরদার করা। পুরো মহড়াজুড়ে দুই দেশের স্পেশাল ফোর্সেস দুর্গম জঙ্গলে যুদ্ধ পরিচালনা, ঝটিকা আকাশপথে আক্রমণ (Air Assault) এবং আধুনিক ড্রোন নজরদারির মতো অত্যন্ত কঠিন ও জটিল প্রক্রিয়ার অনুশীলন সম্পন্ন করেছে।

গহীন জঙ্গলে ঘাতক ট্রেনিং ও আকাশপথে ঝটিকা আক্রমণ
মহড়াকালে উভয় দেশের স্পেশাল ফোর্সেস কমান্ডোদের অত্যন্ত দুর্গম ও ঘন জঙ্গলে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সারভাইভাল ও সামরিক অভিযান চালানোর কঠোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল রিয়েল-টাইম কমব্যাট শুটিং, দুর্গম প্রাকৃতিক বাধা অতিক্রম করা, খাড়া পাহাড়ে বিপজ্জনক চড়াই, হেলিকপ্টার থেকে নিমেষে জওয়ানদের স্পট ডিকোপলিং বা অবতরণ, ট্যাকটিক্যাল পেট্রোলিং এবং অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে শত্রুর গতিবিধি ট্র্যাক করার আধুনিক কলাকৌশল।

আকাশপথে অভিযানের (Air Assault Operations) অংশ হিসেবে কমান্ডোরা যুদ্ধের ময়দানে হেলিকপ্টার থেকে দ্রুত নেমে আসা, দ্রুততম সময়ে ল্যান্ডিং জোন সম্পূর্ণ সুরক্ষিত করা এবং তারপর দ্রুত শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে মিশন সফল করার পুরো প্রক্রিয়াটি নিখুঁতভাবে সম্পাদন করে।

আধুনিক ড্রোন ট্র্যাকিং ও শত্রুর অবস্থান চিহ্নিতকরণ
প্রথাগত যুদ্ধের পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারেও বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছিল এই মহড়ায়। কমান্ডোদের হাই-টেক ড্রোন চালনা ও নজরদারির ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ড্রোনের মাধ্যমে শত্রুর গোপন আস্তানা চিহ্নিত করা, তাদের গতিবিধির ওপর নজর রাখা এবং রিয়েল-টাইম ইন্টেলিজেন্স বা পরিস্থিতি সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহের অনুশীলন চালানো হয়।

এছাড়াও, জওয়ানরা জঙ্গলের মাটি, ভাঙা ডালপালা এবং পদচিহ্ন দেখে শত্রুর চলাচলের পথ ও গতিবিধি নিখুঁতভাবে শনাক্ত করার বিশেষ ট্র্যাকিং কৌশল আয়ত্ত করেন।

৪৮ ঘণ্টার চরম ভ্যালিডেশন অনুশীলন ও জমকালো সমাপ্তি
সাত দিনের টানা কঠোর প্রশিক্ষণের পর আয়োজন করা হয় সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং অংশ— ৪৮ ঘণ্টার একটি নন-স্টপ ‘ফাইনাল ভ্যালিডেশন এক্সারসাইজ’। এই চূড়ান্ত পর্বে উভয় দেশের জওয়ানরা একদম বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রের মতো চরম কৃত্রিম পরিস্থিতিতে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা ও ধৈর্য প্রদর্শন করেন। দীর্ঘ ৪৮ ঘণ্টা ধরে পেট্রোলিং, কমব্যাট ট্র্যাকিং, পর্বত অভিযান এবং স্পেশাল ফোর্সেসের বিভিন্ন গোপন কৌশলকে কঠোরভাবে পরীক্ষা করা হয়।

৫ নভেম্বর আয়োজিত আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইন্দোনেশিয়ায় নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত এবং ইন্দোনেশিয়ান সেনাবাহিনীর ডিভিশন-২-এর সর্বাধিনায়ক। ভারতীয় সেনার তরফে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, এই মহড়ার নির্ধারিত সমস্ত সামরিক ও কৌশলগত লক্ষ্য ১০০ শতাংশ সফলতার সঙ্গে অর্জিত হয়েছে।

ভারত-ইন্দোনেশিয়া প্রতিরক্ষা সম্পর্কের নতুন দিগন্ত
‘গরুড় শক্তি-২০২৬’-এর এই অভূতপূর্ব সফলতা ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার এলিট স্পেশাল ফোর্সেসের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস, ভ্রাতৃত্ব এবং সমন্বয়কে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে উদীয়মান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা এবং দুই বন্ধু রাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে আরও মজবুত করতে এই মেগা সামরিক মহড়া এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও শক্তিশালী বার্তা দিল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *